২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এর প্রভাব পড়ে পাকিস্তানে। দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, ঘরোয়া ও শিল্প খাতে লোডশেডিং নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
গ্যাসের ঘাটতি এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের কারণে দেশের মানুষ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানরা বারবার বিদ্যুৎবঞ্চনার শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। বিশ্ববাজারে সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়া, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে সরকারি প্রণোদনার সুবিধা এবং স্থানীয় উদ্যোগে সৌর শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা গড়ে ওঠে। এ সময় হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও আঞ্চলিক জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ দেশটিকে বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকট থেকে রক্ষা করে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পাকিস্তান গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজির ব্যবহার প্রায় ২০ শতাংশ হলেও তা মূলত রাতের সময় সীমাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী জ্বালানি সংকটে পাকিস্তান সরকারের কৌশলী পদক্ষেপে সৌরবিদ্যুৎ খাতের দ্রুত বিকাশ দেশটির জন্য এক ধরনের আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৩.৬৯ শতাংশই বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের অংশ মাত্র ২.৬৯ শতাংশ। অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপরই নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো হলে দিনের বেলায় বিদ্যুতের বড় অংশের চাহিদা সৌরশক্তি থেকেই পূরণ করা যেত। এতে গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হতো। তবে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব, নীতিগত ধীরগতি এবং সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত উৎসাহের অভাবের কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “২০২১ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু তা অর্জন সম্ভব হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর অনেক দেশ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আবারও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।”
তিনি আরও জানান, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ট্যারিফ নির্ধারিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রভাব এতে পড়ে না। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিশেষ করে শিল্প খাতে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। পাইপলাইনে আরও কমপক্ষে ২০০–৩০০ মেগাওয়াট প্রকল্প অপেক্ষা করছে। শুল্কছাড় এবং অন্যান্য প্রণোদনা দিলে দ্রুতই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।”
বাংলাদেশ প্রতি বছর ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানি করে, যার মধ্যে জ্বালানি তেল, এলএনজি, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সরকার আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছে সহায়তা চেয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার এবং এডিবির কাছ থেকে ২৫ কোটি ডলার আশা করা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা এখনও মূলত গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বড় অংশই জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৮০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি, যার মধ্যে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুত থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট, মোট চাহিদার মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশের কিছু বেশি।
দেশের সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করলে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সক্ষমতা তৈরি সম্ভব। এতে ব্যয়বহুল এলএনজি ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো যাবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ জানিয়েছে, শিল্প-কারখানার ছাদ এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে সৌর ও নবায়নযোগ্য শক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে দেশ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এ ধরনের উদ্যোগ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদাহরণও প্রমাণ করে সৌর শক্তি কতটা কার্যকর। পাকিস্তান ২০২৪ সালের তুলনায় পরবর্তী বছরে ১৫.৪ শতাংশ এলএনজি আমদানি কমিয়েছে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে। একই কারণে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের চাহিদা ১১ শতাংশ কমেছে।
দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সাম্প্রতিক সময়ে সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ কমানো হয়েছে। আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টার দাম ছিল ১৩–১৪ টাকা, আর নতুন প্রকল্পে এটি ৬–৭ টাকা কমানো হয়েছে। বিপিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “বিপিডিবি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে বেশকিছু সৌর প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। আগামীতে আরও কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।”
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১,৬৯৮ মেগাওয়াট, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১,৪০৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১,০২৮ মেগাওয়াট সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত, বাকি ৩৭৭ মেগাওয়াট অফগ্রিড। মোট গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য অংশ মাত্র ৩.৬৯ শতাংশ, সৌরবিদ্যুতের অংশ ২.৬৯ শতাংশ।
দেশের নবায়নযোগ্য শক্তির অগ্রগতিতে নীতিগত জটিলতা ও দক্ষ জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইডের (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু তা অর্জন সম্ভব হয়নি। প্রধান সমস্যা হলো নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাব। সরকার যদি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করে সরঞ্জাম আমদানি সহজ করে, বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।”
তিনি আরও বলেন, “যে ভাবনা আছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট যুদ্ধ শেষ হলে সমাধান হবে, তা সত্য নয়। বরং এটি ভবিষ্যতে বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাই সরকারের জন্য জরুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে আরও বেশি প্রাধান্য দেওয়া। পাকিস্তানের উদাহরণ দেখানো যায়, যেখানে সৌরবিদ্যুতির দ্রুত সম্প্রসারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।”

