সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের দিকনির্দেশনা চাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে আজ রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের একটি জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ জমা দিয়েছিল। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নির্ধারণ করা হবে।
কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, এই সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কিছু প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এর অংশ হিসেবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি ২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেবে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কমিটি এখনও কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে বাস্তবায়নের কথা ছিল। সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলার কারণে এই বরাদ্দ অন্য খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন বেতন কাঠামো সম্ভবত ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে এবং পরবর্তী ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হবে। অতীতের বেতন কমিশনগুলোর ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নজির রয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও সিদ্ধান্তকে জটিল করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। তাই সরকার এখন ব্যয় সাশ্রয়ের নীতি অনুসরণ করছে। আজকের বৈঠকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ও সুপারিশ নিয়ে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত নিজের মতো করে নতুন পে কমিশন গঠন করা। আগের কমিশনের প্রতিবেদনকে কেবল একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে; প্রশ্নহীনভাবে বেতন প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত নয়।
জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আলী খান (এনডিসি) জানান, কমিশন তাদের কাজ সম্পন্ন করে সুপারিশ জমা দিয়েছে। এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে। অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো কমিশনের সুপারিশই শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বর্তমান সুপারিশও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে কিনা তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

