দেশের রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত থেকে। তবে চলতি অর্থবছরে এই দুই খাতই সংকটের মুখে পড়েছে। ক্রয়াদেশ কমতে থাকার কারণে উৎপাদন ও রফতানি উভয়ই নাজুক অবস্থায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। বস্ত্র খাতে আরও ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৭১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। ফলে এই দুই খাতের ঋণের যোগফল দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। তবে ঋণ আরও বাড়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমানে এই দুই খাতে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।
ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, আগেই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রয়াদেশ হ্রাসের এই হারে উদ্যোক্তারা শিগগিরই খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে। রফতানি উন্নতি না হলে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এমনকি পুনঃতফসিল ও নীতিসহায়তার উদ্যোগও কার্যকর নাও হতে পারে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ থেকে রফতানি ৪.৮৫ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই হ্রাসের ফলে ঋণ পরিশোধে নতুন সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানায়, জুলাই-মার্চে দেশের পণ্য রফতানি হয়েছে ৩,৫৩৮ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩,৭১৯ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৫.৫ শতাংশ। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখায়, জুলাইতে ২৪.৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরের আট মাস নেতিবাচক। বিশেষ করে মার্চে রফতানি কমেছে ১৮ শতাংশ।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ক্রয়াদেশ হ্রাসে কারখানার অর্ধেক সক্ষমতা বন্ধ। ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে না পারলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ অসম্ভব। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।’
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ খেলাপি। তার মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের। রফতানি আয়ের ধারা পেছনে যাওয়ার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ প্রভাব ফেলেছে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ক্রয়াদেশ বাড়ছে না, উৎপাদন ব্যাহত। সরকারকে দ্রুত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। না হলে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে যাবে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা কমেছে ১০.৬৯ শতাংশ এবং নিষ্পত্তির হারও ৬.৬৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আগের অর্থবছরে এলসির প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৫ শতাংশেরও বেশি।
দেশের শীর্ষ রফতানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইয়াংওয়ান, ডিবিএল, স্কয়ার, প্যাসিফিক জিন্সের মতো গ্রুপগুলোর রফতানি আয়ের ৯০-১০০ শতাংশ তৈরি পোশাক থেকে আসে। চলতি অর্থবছরে তাদের ব্যবসাও চাপে। অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, ‘ক্রয়াদেশ কমে ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রধান রফতানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে ১.১০ শতাংশ, জার্মানিতে ১৩.৫৪ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ১.৩৯ শতাংশ। তবে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্য কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
বিটিএমএ পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, ‘সুতার দাম বাড়ায় স্থানীয় মিলের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। সুতা বিক্রি বাড়লে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাড়বে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার স্থগিত রাখা উৎপাদনকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াবে।’

