আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেল ও অকটেনেই আগামী ছয় মাসে সরকারের প্রায় ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে বড় লোকসানের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির প্রায় ১০৪ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। অন্যদিকে অকটেনে লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ টাকা প্রতি লিটার।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বিপিসি ৬২ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার মোট ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন ও জেট ফুয়েলের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো ওঠানামা সরাসরি দেশের আর্থিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও সরকার এখনই দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর ফলে ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত দাম অপরিবর্তিত থাকলে শুধু ডিজেলেই প্রায় ২৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা এবং অকটেনে প্রায় ৯৪৯ কোটি টাকার লোকসান হতে পারে। মোট মিলিয়ে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার বেশি।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৭ ডলার, তা এখন ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। একইভাবে ডিজেলের আন্তর্জাতিক দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিতে আপাতত দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। প্রতিদিন বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। তাই তারা বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ও বাস্তবসম্মত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি খাতকে বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, যার প্রভাব অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও পড়তে পারে।

