দেশের গত এক দশকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট বিভাগ। অন্যদিকে একই সময়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে সবার পেছনে রয়েছে বরিশাল। তবে ইউনিট ও কর্মসংস্থানে সবেচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক এ শুমারিতে শিল্প ও সেবা খাতের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।
শুমারিতে দেশের শিল্প ও সেবা খাতের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে গতকাল এই ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিক। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প পরিচালক দিপংকর রায়।
শুমারি অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বেড়েছে প্রায় ৩৮ লাখ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২। ২০১৩ সালের শুমারিতে এই সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫। বিভাগের ভিত্তিতে দেখা গেছে, সর্বাধিক ইউনিট বেড়েছে ঢাকা বিভাগে (২৭%), এরপর চট্টগ্রাম ১৭.৫১%, রাজশাহী ১৪.৩৬%, খুলনা ১২.৭৩%, রংপুর ১১.৪১%, ময়মনসিংহ ৬.৬৩% এবং বরিশাল ৫.৬১%। সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট, যেখানে মাত্র ৪.৬৭% ইউনিট গড়ে উঠেছে।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা জেলায় সর্বাধিক অর্থনৈতিক ইউনিট (প্রায় ৯%), চট্টগ্রামে ৫%, ময়মনসিংহে ৩%, কুমিল্লায় ৩% এবং বগুড়ায় ৩% ইউনিট গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—বান্দরবান (০.২৭%), রাঙ্গামাটি (০.৪২%) ও খাগড়াছড়ি (০.৪৫%)।
দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১। ২০১৩ সালে সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০। এক দশকে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫.০৩%। মোট কর্মসংস্থানে পুরুষের অংশ ৮৩.২৮%, নারীর ১৬.৭১% এবং তৃতীয় লিঙ্গের ০.০১%। ২০১৩ সালের তুলনায় পুরুষের অংশ সামান্য কমেছে, নারীর অংশ বেড়েছে।
কর্মসংস্থানে বিভাগের ভিত্তিতে ঢাকা এগিয়ে (৯.৫১%), সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল (৪.১৮%)। জেলা ভিত্তিতে সর্বনিম্ন কর্মসংস্থান বান্দরবান (৮১,৬৪৪ জন, ০.২৬%), এরপর নড়াইল (০.৩২%), ঝালকাঠি (০.৩৭%), রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি (০.৪১% প্রতি জেলা)।
অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী ৫৩.৫৭%, অস্থায়ী ৪.৯১% এবং গৃহস্থালি ৪১.৫২%। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে সেবা খাতের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, মোট ইউনিটের ৯০% (১ কোটি ৫ লাখ)। শিল্প খাতের ইউনিটের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ৯.৯৮%। ব্যবসার ধরনে পাইকারি-খুচরা ব্যবসা ও মোটরযান মেরামত খাতের অংশ সবচেয়ে বড়, ৪১.৮২%।
শিল্পের আকার অনুযায়ী মাইক্রো ও কুটির শিল্পের প্রাধান্য স্পষ্ট। মোট ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো শিল্প ৫৬.৬৭% (৬৬ লাখ ৩১ হাজার), কুটির শিল্প ৩৮.৭৪% (৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯)। ক্ষুদ্র শিল্প ৪.২০%, মাঝারি ০.৩১% এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ০.০৮%।
মালিকানার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন (৮৭.৩৬%)। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ১.৮২%, অংশীদারিত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ১.৪৪%। গ্রামীণ অর্থনীতিতে শহরের তুলনায় ইউনিটের সংখ্যা বেশি—৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি বনাম শহরে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি।
শুমারি থেকে জানা যায়, ব্যবসা পরিচালনায় উদ্যোক্তারা আট ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। শীর্ষ সমস্যা মূলধনের অভাব, ৮৬% উদ্যোক্তা এটি স্বীকার করেছেন। এর পাশাপাশি ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, দক্ষ শ্রমশক্তির ঘাটতি, কাঁচামালের অপর্যাপ্ততা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পণ্য বিপণনের সমস্যা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উল্লেখযোগ্য।
মোটের ওপর দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি গত এক দশকে শক্তিশালীভাবে প্রসারিত হয়েছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে, ক্ষুদ্র ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট, তবে মূলধন ও অবকাঠামোর ঘাটতি উদ্যোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

