বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এমন একটি বাজার খুঁজছেন যা স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং ঝুঁকি কম কিন্তু দেশের পুঁজিবাজার এখনও সেই পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক।
২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেনার চেয়ে বেশি শেয়ার কিনেছিলেন। এই সময় তাদের লেনদেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছিল। জানুয়ারিতে তারা ১৯৭ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন এবং ১৭৯ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে কিনেছেন ৪৬০ কোটি টাকার শেয়ার, বিক্রি করেছেন ২০৩ কোটি টাকার। এর ফলে বিদেশিদের মোট লেনদেন যথাক্রমে ৩৭৭ ও ৬৬৩ কোটি টাকা।
কিন্তু মার্চে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র ৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন, কিন্তু বিক্রি করেছেন ২২১ কোটি টাকার শেয়ার। এতে গত মাসের মোট লেনদেন দাঁড়ায় ২৭২ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি কম। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
কেন বিদেশিদের আস্থা কমেছে?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশার কারণে জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা লেনদেন বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ধস নেমেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি ধারা:
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ কমছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ৩২ কোটি ডলারের শেয়ার লেনদেন করেছেন। মাসিক গড় লেনদেন ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের মাসিক লেনদেনের বিস্তারিত:
- জানুয়ারি: ১.৫ কোটি ডলার
- ফেব্রুয়ারি: ২.২ কোটি ডলার
- মার্চ: ১.৪ কোটি ডলার
- এপ্রিল: ৩.৫ কোটি ডলার
- মে: ৪.১ কোটি ডলার
- জুন: ২.৩ কোটি ডলার
- জুলাই: ৪ কোটি ডলার
- আগস্ট: ৩.১ কোটি ডলার
- সেপ্টেম্বর: ৩.৬ কোটি ডলার
- অক্টোবর: ৩ কোটি ডলার
- নভেম্বর: ২.১৯ কোটি ডলার
- ডিসেম্বর: ১.১৯ কোটি ডলার
ডিএসইর দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে বিদেশিদের লেনদেনে অংশগ্রহণ কমে ৩.৮৫ শতাংশ থেকে ১.২২ শতাংশে নেমে গেছে। বিশেষ করে ২০১৬–২০২০ সালে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা ০.৮৯ ও ০.৭৭ শতাংশে নেমে গেছে। টাকার পরিমাণে এই দুই বছরে বিদেশি বিনিয়োগ ৪,১৮০ কোটি ও ২,১৬৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে লেনদেন সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৯২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পুরনো রেকর্ডে দেখা যায়:
- ২০১৭ সালে: ১১,৪৪৮ কোটি টাকা (২.৬৪%)
- ২০১৮ সালে: ৯,২৭৩ কোটি টাকা (৩.৪৮%)
- ২০১৯ সালে: ৭,৮২৩ কোটি টাকা (৩.৪৪%)
- ২০২০ সালে: ১০,৩৮৮ কোটি টাকা (৩.৮৫%)
- ২০২১ সালে: ৭,৭৬৪ কোটি টাকা (১.১০%)
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা না ফেরালে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন ও ভরসা দুটোই সংকুচিত থাকবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজারের স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিকূলতা—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য মূল চাবিকাঠি।

