মার্চ থেকে মে—ইউরোপে এই তিন মাস এলেই ক্যালেন্ডারে একের পর এক সরকারি ছুটির সারি। ইস্টার মানডে, লেবার ডে, হুইট মানডে—ধর্মীয় ও সামাজিক নানা উপলক্ষ ঘিরে এই ছুটিগুলো সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি আর উদ্যাপনের সময়। তবে অর্থনীতির হিসাব-নিকাশে ছবিটা ভিন্ন। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে, উৎপাদন ব্যাহত হয়—ফলে এসব ছুটির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিতর্কের মাঝেই কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডেনমার্ক। ২০২৪ সালে দেশটি প্রায় ৩৪০ বছরের পুরোনো ধর্মীয় ছুটি ‘গ্রেট প্রেয়ার ডে’ বাতিল করে। সরকারের যুক্তি, প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ জোগাড় করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কোপেনহেগেনের হিসাব অনুযায়ী, একটি ছুটি কমানো গেলে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডেনিশ ক্রোনার, অর্থাৎ প্রায় ৪০ কোটি ইউরো অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। ডেনিশ সরকার জানিয়েছে, ন্যাটোর নির্ধারিত জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় নিশ্চিত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
ডেনমার্কের এই উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। ২০১২ সালে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পর্তুগালও চারটি সরকারি ছুটি বাতিল করেছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০১৬ সালে সেগুলো আবার চালু করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ তৈরি হলে ব্যয় কমানোর সহজ উপায় হিসেবে ছুটির দিন কমানোর বিষয়টি সামনে আসে। কারণ এতে সরাসরি কর্মঘণ্টা বাড়ে এবং উৎপাদনও কিছুটা বাড়তে পারে।
গবেষক লুকাস রোসো ও রদ্রিগো ওয়াগনারের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রতিটি সরকারি ছুটি বছরে মোট উৎপাদন প্রায় ০.০৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করেছে।
তবে সব খাতে প্রভাব সমান নয়। উৎপাদনমুখী শিল্পে ছুটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়লেও কৃষি বা খনি খাতে কাজ অনেক সময় চলমান থাকে, ফলে ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। অন্যদিকে ছুটির দিনে মানুষের ভ্রমণ ও বিনোদন ব্যয় বাড়ায় পর্যটন ও সেবা খাতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাবও দেখা যায়।
বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা ধরা যায়। ২০২৪ সালে দেশটির জিডিপি ৪.৩ ট্রিলিয়ন ইউরোর বেশি। সেই হিসেবে একটি কর্মদিবস কমে গেলে প্রায় ৩৪০ কোটি ইউরো সমমূল্যের উৎপাদন হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, সরকারি ছুটি একদিকে যেমন মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে তৈরি করে চাপ। তাই ভারসাম্য রক্ষাই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

