বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সীমিত থাকলেও সরকারি খাতে ঋণের গতি তীব্র বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ তিন মাস বাকি থাকতেই সরকার ইতিমধ্যেই পুরো বছরের জন্য নির্ধারিত ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থমন্ত্রী এবার ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন। তবে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার নিয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকায়।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রতিবছরই ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু এবার যুদ্ধসহ নানা কারণে সরকারি খরচ বেড়ে গেলেও রাজস্ব আয় ততটা বাড়েনি। বিদেশি উৎস থেকেও প্রয়োজনীয় ঋণ আসছে না। ফলে সরকারি ঋণ চাহিদা পূরণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিয়মিত নিলামের বাইরে বিশেষ নিলাম আয়োজন করতে হচ্ছে।
বিশেষ নিলামের মাধ্যমে গত ১ এপ্রিল সরকার নিয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আজ ৮ এপ্রিল আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকার জন্য নতুন নিলাম ডাকল সরকার। ফলে এই অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত ঋণ কতখানি বাড়বে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তুলনামূলকভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে ধরা হয় ৯৯ হাজার কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ৩২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঋণ স্থিতি বেড়ে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার ৯ মাসে নিয়েছে ৭৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যা ঋণ স্থিতি পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের শুরুতে সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধ বেশি ছিল। গত অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধ ৫০৩ কোটি টাকা বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানিসংকট এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নতুন ঋণ গ্রহণে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এছাড়া ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

