দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপের ২১ হাজারের বেশি শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে বেতন ও ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে তারা চাকরি হারানোর ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এই ঘটনায় তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়ের করা মামলায় কারাবন্দি আছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে একের পর এক গ্রেপ্তার শুরু হয়। নজরুল ইসলাম মজুমদারও ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন।
গ্রেপ্তারের পর নজরুলের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারা অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বেতন ও ভাতা বকেয়া পড়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে শ্রমিক নেতাদের উপস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় সভায় নাসা গ্রুপের ৩৪টির মধ্যে ১৬টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ত্রিপক্ষীয় সভায় জানানো হয়, বিদ্যুৎ–গ্যাস সংকট এবং ক্রয়াদেশ না থাকার কারণে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এসব কারখানার কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এসব কারখানা রয়েছে ইটখোলা, ঘোষবাগ, আশুলিয়া, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ১০টি, গাজীপুরে দুটি, চট্টগ্রাম ইপিজেডে দুটি ও কুমিল্লা ইপিজেডে দুটি কারখানা অবস্থিত।
নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ‘সার্ভিস বেনিফিট’ পরিশোধের কথা আদালতের নির্দেশে ভোটের আগে অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল। তবে সেই কোনো অগ্রগতি হয়নি। একাধিকবার কারখানা খোলার আশ্বাস দিলেও আজ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বেতন-ভাতার দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। পরে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা বিকালে অবরোধ প্রত্যাহার করেন। গত সোমবার শ্রম মন্ত্রণালয়ে শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা শেষে মন্ত্রী জানান, পোশাক খাতের নাসা মেইনল্যান্ড গার্মেন্টসের ‘স্বাভাবিক কার্যক্রম’ ধীরে ধীরে পুনরায় শুরু হবে।
জানা গেছে, কোংপানির ফিন্যান্স ডিরেক্টর স্বপন কুমার নজরুলের স্বাক্ষর নকল করে বড় অঙ্কের টাকা তোলেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর এড়াতে তোলা ঋণ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে না দিয়ে নগদ লেনদেন করতেন। এমনকি বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারতে পাচার করার অভিযোগও রয়েছে। স্বপন কুমার প্রতিবেদকের ফোনে বারবার রিসিভ না করায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সভাপতিত্বে ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করছে। একীভূত পাঁচ ব্যাংকসহ জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কমার্স ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নাসা গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, যা প্রায় পুরোপুরি খেলাপি। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ ২২ হাজার ৪৫৪ টাকার অবৈধ সঞ্চয়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাবেক চেয়ারম্যানের অপকর্মের কারণে এক্সিম ব্যাংক ও নাসা গ্রুপ সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণে ব্যাংক ও শিল্পগ্রুপের অনেক কর্মচারী এবং গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নাসা গ্রুপের আশুলিয়া কারখানার এক কর্মকর্তা জানান, ফ্যাক্টরিগুলো এখনও বন্ধ রয়েছে এবং কখন পুনরায় খোলা হবে তা নিশ্চিত নয়।

