গত ৪ মার্চ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেন। ‘আসিফ নজরুলের দুর্নীতি?’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, জীবনের কোনো পর্যায়েই তিনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
পোস্টে আসিফ নজরুল বলেন, সরকারে দায়িত্ব পালনকালীন সময় হোক বা এর আগে-পরে—কোনো সময়ই তিনি দুর্নীতি করেননি। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, “এক টাকা—আবার বলি, এক টাকাও দুর্নীতি করিনি।” একই সঙ্গে তার জ্ঞাতসারে কাউকে দুর্নীতি করতে দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
নিজের আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টিও তুলে ধরেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তার দাবি, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি কোনো নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেননি এবং তার নামে নতুন কোনো সম্পদও যোগ হয়নি। এছাড়া আয়কর দেওয়ার সময় কোনো সম্পদ গোপন রাখা হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সবশেষে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, তিনি কোনো ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত নন এবং এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
আসিফ নজরুলের দাবি কতটুকু সঠিক?
এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত দাবি করলেও তার এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সময়ে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বদলি বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদানের মতো বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, তার নামে সরাসরি সম্পদ না থাকলেও বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনদের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে সাবেক স্ত্রী রোকেয়া প্রাচী এবং তার দুই কন্যার সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে একজন কন্যার নামে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকায় একটি বাড়ি কেনার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়—কীভাবে অল্পবয়সী একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে এমন সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব হলো।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তার পূর্বের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে স্বচ্ছতার দাবি করেছেন।
সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে সর্বাধিক ঘুষ কেলেঙ্কারি:
সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দায়িত্বকালীন সময়ে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ইস্যুতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিবেদনে এই খাতটিকে তার দেড় বছরের দায়িত্বকালের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসের সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলেও দাবি করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, ঘুষের প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধ না হলে কোনো কোনো বদলির আদেশ স্থগিত রাখার ঘটনাও নাকি ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে একাধিকবার বদলির উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে অন্তত ২৮২ জনকে বদলি করা হয়, যাদের একটি বড় অংশ ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থল পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ভালো পদে বদলির জন্য বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে এবং সাধারণ বদলির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে। অতীতে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক বদলির নজির নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক পিএস সামসুদ্দিন মাসুমসহ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য এবং আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুল বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে আসিফ নজরুল নিজেই প্রকাশ্যে সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের আর্থিক স্বচ্ছতার দাবি করেছিলেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে এবং ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করার নিয়ম থাকলেও, সংশ্লিষ্ট সময়ে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘুষের বিনিময়ে ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের কিছু সাব-রেজিস্ট্রারকে উচ্চতর গ্রেডের কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘুষ দিতে অনিচ্ছুক ‘এ’ গ্রেডের কর্মকর্তাদের নিম্ন গ্রেডের অফিসে ‘শাস্তিমূলক’ বদলির অভিযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তাকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে এবং যোগদানের আগেই পুনরায় বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এতে বলা হয়, বদলি বাণিজ্যের মাত্রা বাড়তে থাকায় গত বছরের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং সম্ভাব্য প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হয়। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই সতর্কতা জারির আগেই বিপুলসংখ্যক বদলিতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আর নতুন কোনো বদলির আদেশ দেওয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে অনিয়ম অতীতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট সময়ে তা নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হয়েছে। তাদের মতে, বিষয়টি তদন্ত করলে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক জেলা রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি ও বদলির আদেশ দেওয়া হলেও সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রথম বড় আকারের বদলি আদেশ জারি করা হয় ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই আদেশে ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়, যেখানে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
একাধিক নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যেমন, সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে বদলি করা হয়। পরবর্তী চার মাসের মধ্যে তাকে আবার দিনাজপুরের হাকিমপুরে বদলি করা হয় এবং যোগদানের আগের দিন পুনরায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
একইভাবে, সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হলেও দুই দিনের মধ্যে তিনি আবার বরিশালের মুলাদীতে যোগ দেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দ্রুত বদলির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আবদুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও যোগদানের আগের দিন সেই আদেশ স্থগিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্তদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রকাশ্যে সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজের অবস্থানকে স্বচ্ছ বলে দাবি করেছেন।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি সংক্রান্ত অন্তত ১৬টি আদেশ জারি করা হয়। এসব আদেশের মাধ্যমে কয়েক দফায় বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে মোট ৮৭ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ৪ সেপ্টেম্বর ১০ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭ জন, ৭ অক্টোবর ৫ জন, ১ ডিসেম্বর ৩৮ জন এবং ১৯ ডিসেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রার বদলির আদেশ পান।
পরবর্তী বছর ২০২৫ সালে বদলির হার আরও বেড়ে যায়। ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আদেশে মোট ১৯৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জানুয়ারি ৫ জন, ১৫ জানুয়ারি ১২ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৭ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৬ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৭ মার্চ ২৬ জন, ৯ এপ্রিল ৩৬ জন, ১০ এপ্রিল ৪ জন এবং ২৭ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৪৫ জনকে বদলি করা হয়। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ে বড় আকারে বদলির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব বদলির একটি অংশে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অন্তত ২০০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেওয়ার মাধ্যমে তাদের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বিচারক বদলিতে বিপুল ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ:
গত বছরের জুনে দেশের নিম্ন আদালতে একযোগে ব্যাপক বদলির ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। ২ জুন আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সারা দেশের ২৫২ জন বিচারককে একসঙ্গে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩০ জন জেলা ও দায়রা জজ ও সমপদমর্যাদার কর্মকর্তা, ৩৮ জন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ২২ জন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং ১৬২ জন সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজকে বদলি করা হয়। তাদের ৩ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই একযোগে বদলির ঘটনায় বিচারাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের মতে, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ঢালাও বদলি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বদলির পেছনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিচারক বদলির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং এতে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিচারক বদলিকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের একটি প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে এবং ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হয়। এতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুল বা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে তিনি প্রকাশ্যে সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের অবস্থানকে স্বচ্ছ বলে দাবি করেছেন।
জামিন বাণিজ্যে বিপুল দুর্নীতি:
প্রতিবেদনে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে জামিন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, টাকার বিনিময়ে তিনি কিছু মামলার আসামিদের জামিন প্রদান করেছেন। এসব ঘটনায় বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, শেয়ার জালিয়াতি ও ভাই হত্যার মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন হোসেনকে একদিনে তিনটি মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনের দাবি, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি যে আদালত জামিন দিয়েছে, তার জন্য এই এখতিয়ার ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া, গান বাংলার তাপসের জামিনও টাকার বিনিময়ে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শুধু তা-ই নয়, তার বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত দুই ডজনের বেশি ব্যক্তিকে—যাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন—অর্থের বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুল বা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে তিনি প্রকাশ্যে সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজের অবস্থানকে স্বচ্ছ বলে দাবি করেছেন।
জেলা প্রশাসক পদায়নে দুর্নীতি:
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টার পরপরই তার কর্তৃত্ব ও প্রভাব এতটা ছিল যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রধান উপদেষ্টা তার পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর কিছু আমলাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিলেন সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সারা দেশে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ শুরু করেন। এই সময় ডিসি নিয়োগে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য গঠিত একটি তদন্ত কমিটিতে আসিফ নজরুলকে একক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোখলেসুর রহমানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আসিফ নজরুল তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করেন এবং বিনিময়ে ডিসি পদায়নে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের নাম প্রাধান্য দেন।
তবে বিতর্কও ঘটে। চট্টগ্রামের ডিসি নিয়োগে আসিফ নজরুলের পছন্দের প্রার্থীর বিপরীতে ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও প্রার্থী হন। দুই পক্ষই বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রার্থী দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মোখলেসুর রহমানকে জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার কারণে তখন ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছিল।
এছাড়া, প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আসিফ নজরুল শুধু জেলা প্রশাসক নয়, অনেক সচিবের পদায়ন নিয়েও কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইন সচিব হিসেবে গোলাম সারোয়ারকে রাখা হয়েছিল আসিফ নজরুলের ইচ্ছায়। সারোয়ার ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অত্যন্ত বিশ্বস্ত। অভিযোগ, ১০ কোটি টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তাকে সচিব পদে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সময়মতো টাকা না দেওয়ায় তাকে পরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
রিক্রুটিং লাইসেন্সে ঘুষ কেলেঙ্কারি:
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও সামলেছেন। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদান শুরু করেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকার লেনদেনের সুযোগ পান।
২০২৫ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যেখানে বাংলাদেশে এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। জনশক্তি রপ্তানির খাতে ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে ১,৯৮৮টি, তবে বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৬৪৬। শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন আরও ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেয়, যা মূলত আসিফ নজরুলের ইচ্ছায় বলে অভিযোগ করা হয়। এসব লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য সাবেক উপদেষ্টা এক থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই দিনে আরও ২৬০টি আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যারা নির্দিষ্ট চ্যানেল ধরে অর্থ প্রদান করতে পারেননি, তাদের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমানো ও কার্যকর তদারকি ছাড়া প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্বেতপত্রের তথ্যমতে, দেশের অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তারা দালাল বা সাব-এজেন্টদের ওপর নির্ভর করে, যা স্বচ্ছতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার সুযোগ তৈরি করে।
গত ১০ বছরে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ প্রবাসী এজেন্সি বা দালালদের খরচ পরিশোধ করার পরও বিদেশ যেতে পারেননি। এতে প্রবাসী কর্মীদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৫৯ কোটি ডলার। প্রতি বছরই রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে অভিযোগ জমা পড়ে ২,২১৩টি, ২০২৩ সালে ২,৩৮০টি, ২০২২ সালে ১,২৪০টি, ২০২১ সালে ৫৮২টি এবং ২০২০ সালে ৯০৫টি।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আসিফ নজরুল অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি এবং এ বিষয়ে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রভাব রয়েছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

