নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার প্রথম অর্থবছরেই বড় আকারের সম্প্রসারণমূলক বাজেটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। লক্ষ্য একদিকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনা। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলিত নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এই বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চলতি বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান সক্ষমতায় এটি অর্জন কঠিন।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব বাড়াতে কর অব্যাহতি কমানো, ভ্যাট বাড়ানো এবং আমদানি শুল্ক বাজারভিত্তিক করার মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণত বাজেট ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ে। কিন্তু এবার ২৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা রাজস্ব আহরণকে বড় চাপে ফেলবে। তিনি মনে করেন, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে জোর দেওয়াই উচিত।
বাজেটের অগ্রাধিকার:
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটিতে নেমে এসেছে। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আদায় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কৃষিখাতে সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের বাধা দূর করতে ডি-রেগুলেশন নীতিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও জোর দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, ক্রীড়া এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ এবং ক্রীড়াবিদদের প্রণোদনা চালু হয়েছে।
ঘাটতি ও অর্থায়ন পরিকল্পনা:
নতুন বাজেটে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে, যা জিডিপির ৯.২১ শতাংশ। যদিও বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে।
রাজস্ব বাড়াতে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করের আওতা বৃদ্ধি এবং করবহির্ভূত আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে। এনবিআরের বাইরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার অভ্যন্তরীণ উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে তুলনামূলক কম সুদের বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে চায়। কারণ, সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়। আগামী বাজেটে সুদ পরিশোধে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বা আর্থিক খাতে তারল্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সুদের ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয় ও বিনিয়োগ:
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি বিনিয়োগও ত্বরান্বিত হয়। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৪.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ভর্তুকির বাড়তি চাপ:
বাজেট বড় হলেও ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার ও খাদ্য খাতে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, যা চলতি বছরের তুলনায় বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন সময়েই অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে মাসে ২,৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে রেমিট্যান্সে প্রণোদনা ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা এডিপিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে।
উন্নয়ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সড়ক পরিবহন খাত। এরপর বিদ্যুৎ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাত রয়েছে।

