বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার চেষ্টা করছে।
কারণ বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। পরিবর্তন এসেছে বিনিয়োগের ধরন, অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং বিনিয়োগ মূল্যায়নের মানদণ্ডেও। এ পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় ব্যাংকগুলোর প্রধান গ্রাহক হওয়া উচিত বেসরকারি খাত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি ঋণের চাপের কারণে সেই ভারসাম্যে প্রভাব পড়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতি একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা কাঠামো ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছাতে চায়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নতুন বাজেটে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকলে সরকারি ঋণের পরিমাণ আরও কমবে এবং ব্যাংকিং খাতের অর্থের বড় অংশ বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যবহৃত হবে। এতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা যেখানে বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
এ বিষয়ে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস সম্প্রসারণের দিকে এগোচ্ছে। তিনি জানান, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতীতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা ১৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয়ও বাড়াবে।
ব্যাংক ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ সচিব জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের সামনে বিকল্প অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি সরকার ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক বন্ড ছাড়ে। এর বিপরীতে প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়ে। এতে বিকল্প বিনিয়োগমাধ্যমের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
অর্থ সচিব আরও জানান, সরকার ঋণনির্ভর অর্থায়নের পরিবর্তে ধীরে ধীরে ইক্যুইটি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন বন্ড, অরেঞ্জ বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজার ও আর্থিক বাজারকে আরও গভীর এবং কার্যকর করার কাজও চলমান রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম ও নতুন অর্থায়ন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হবে।

