বাংলাদেশে কর নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করের পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার এক গভীর বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। মূল প্রশ্নটি সরল—রাষ্ট্র কি বেশি কর তুলতে চায়, নাকি ন্যায্যভাবে কর আদায় করতে চায়?
সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কিছু বক্তব্য গণমাধ্যমে এমনভাবে এসেছে, যেন বড় ধরনের কর বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে কিছু ভুল ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
দেশে যে অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়মিত কর দেন—মূলত বেতনভুক্ত পেশাজীবী, স্বচ্ছ ব্যবসায়ী ও করপোরেট কাঠামোর মধ্যে থাকা ব্যক্তি—তারা ইতোমধ্যেই চাপে আছেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ তাদের সঞ্চয় ও ভোগক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
একজন করদাতার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নিয়ম অনুযায়ী কর রিটার্ন দাখিল করে তাকে বড় অঙ্কের কর দিতে হয়েছে, সঙ্গে সম্পদ কর বা ওয়েলথ সারচার্জও যুক্ত হয়েছে। এর বাইরে দৈনন্দিন ভোগব্যয়ে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হয়। সব মিলিয়ে একজন সৎ করদাতার অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও বাস্তবতা ভিন্ন প্রশ্ন তোলে।
কারণ সমাজে এমন অনেকেই আছেন, যাদের জীবনযাত্রা বিলাসী হলেও তারা কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে যান। এই বৈষম্য থেকেই তৈরি হয় ‘পেট কেটে কর দেওয়া’—এমন ধারণা। বেতনভুক্ত বা স্বচ্ছ আয়কারীদের ক্ষেত্রে কর সরাসরি আয়ের উৎস থেকেই কেটে নেওয়া হয়। ফলে তাদের জন্য কর দেওয়া একটি বাস্তব চাপ, যা সরাসরি পরিবারের বাজেটে প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে দেশের বড় একটি সম্পদভান্ডার করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটিই রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর করহার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। নীতিগতভাবে এটি গ্রহণযোগ্য—যাদের আয় বেশি, তাদের অবদানও বেশি হওয়া উচিত।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কাকে ধনী ধরা হবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্পদের ধরন বদলে গেছে। অনেক আয় অদৃশ্য বা দেশের বাইরে সরে যায়, আবার অনেক লেনদেন অনানুষ্ঠানিক বা ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে ঘটে। ফলে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যনির্ভর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের কিছু বেশি, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। এই অবস্থায় শুধু করহার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বরং কর আদায়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং করের আওতা সম্প্রসারণই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান ব্যবস্থায় কর আদায়ের বড় অংশ আসে তাদের কাছ থেকে, যাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। উৎসে কর কেটে নেওয়ার ফলে তারা বাধ্য হয়ে সময়মতো কর দেন। বিপরীতে, প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি নানা উপায়ে কর এড়িয়ে যান বা ফাঁকফোকর ব্যবহার করেন। এই দ্বৈত বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে।
এক্ষেত্রে প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। করহার বাড়ানো সহজ হলেও কার্যকর প্রয়োগ কঠিন। আয় শনাক্তকরণ, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন, তথ্য বিনিময় ও ডিজিটাল নজরদারি ছাড়া উচ্চ করহার বাস্তবে কার্যকর হয় না।
একই সঙ্গে জবাবদিহিতাও জরুরি। নাগরিকরা তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হন, যখন তারা দেখতে পান সেই অর্থ জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণপরিবহনে দৃশ্যমান উন্নয়ন না থাকলে করের প্রতি অনীহা বাড়ে।
ডিজিটালাইজেশন এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কর ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করা গেলে হয়রানি ও দুর্নীতি কমবে, পাশাপাশি করদাতার আস্থাও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। এটি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে না। বরং দীর্ঘদিন করের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোকে করজালে আনা জরুরি।
২০২৪ সালের শুরুতে অর্থনীতি সমিতির এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ ধনী কর দেয় না। এই বড় অংশকে করের আওতায় আনতে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ব্যাংক তথ্যের সঙ্গে টিআইএন ডেটাবেজ যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে আয় ও সম্পদের অসঙ্গতি শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে বিলাসবহুল গাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট বা বিদেশ ভ্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চবিত্তদের চিহ্নিত করা যেতে পারে। প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা বন্ধ করে কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কর প্রদান প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অনলাইন ও হয়রানিমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, কার্যকর কর ব্যবস্থা মানে সবার ওপর বেশি কর চাপানো নয়। বরং প্রত্যেকে তার প্রকৃত সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যায্য কর দেবেন—এই ভারসাম্যই নিশ্চিত করা জরুরি। তখন কর দেওয়া আর কষ্টের বিষয় না হয়ে নাগরিক দায়িত্বের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবে।

