প্রস্তাবিত নতুন অর্থবিলে জমি উন্নয়ন চুক্তির ক্ষেত্রে কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। নতুন বিধান কার্যকর হলে ডেভেলপারের কাছ থেকে পাওয়া নগদ অর্থের পাশাপাশি ফ্ল্যাট বা অন্য যেকোনো অ-নগদ সুবিধার মূল্যও ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের আওতায় আসবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত অর্থবিলে আয়কর আইনে এ সংক্রান্ত সংশোধনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে জমির মালিকরা ডেভেলপারদের কাছ থেকে যে অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্যান্য সুবিধা পাবেন, সেগুলোকে করযোগ্য সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হবে।
বর্তমানে জমির মালিকরা ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তির সময় যে নগদ অর্থ গ্রহণ করেন, তা ‘সাইনিং মানি’ নামে পরিচিত। এই অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স দিতে হয়। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর কোনো কর আরোপ করা হয় না।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। জমির বিনিময়ে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য নির্ধারণ করা হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকার নির্ধারিত মৌজামূল্যের ভিত্তিতে। এরপর ওই সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অংশকে মূলধনী মুনাফা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর ধার্য করা হবে।
কীভাবে নির্ধারণ হবে কর:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন আগে কেনা জমির ক্ষেত্রে নতুন নিয়মে করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি ২০ বছর আগে ৫০ লাখ টাকায় ১০ কাঠা জমি কিনে থাকেন এবং পরে সেই জমি ডেভেলপারের কাছে উন্নয়নের জন্য দেন, তাহলে তিনি সাইনিং মানি হিসেবে ৫০ লাখ টাকা পেতে পারেন। একই সঙ্গে ২০টি অ্যাপার্টমেন্টের একটি প্রকল্প থেকে ১০টি অ্যাপার্টমেন্টও পেতে পারেন।
যদি প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের মৌজামূল্য ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে ১০টি অ্যাপার্টমেন্টের মোট মূল্য দাঁড়াবে ৫ কোটি টাকা। সাইনিং মানিসহ মোট প্রাপ্তির পরিমাণ হবে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে জমি কেনার সময়ের ৫০ লাখ টাকা অর্জনমূল্য হিসেবে বাদ দেওয়া হবে। ফলে অবশিষ্ট ৫ কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে, যার পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৫ লাখ টাকা।
করের পরিমাণ অবশ্য এলাকা ও সম্পত্তির ধরনভেদে ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে অর্জনমূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় করের অঙ্ক আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের জন্য পৃথক মৌজামূল্য নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে এসব মূল্য হালনাগাদ করে সংশ্লিষ্ট কমিটি। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১০ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয় এবং এর বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
উদ্বেগে আবাসন খাত:
নতুন কর প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডেভেলপার ও কর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপনের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা করফাঁকির ঝুঁকিও বৃদ্ধি করবে। তাদের আশঙ্কা, মূল্য গোপনের সুযোগ সীমিত হলে অতিরিক্ত করের চাপ শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দামে প্রতিফলিত হবে। এতে ব্যবসায়ীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্রেতারা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক সহসভাপতি এম এ আউয়াল বলেন, এই খাতে নতুন কর আরোপ করা হলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য আড়াল করার প্রবণতা বাড়তে পারে। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে কর বৃদ্ধি না করাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
কর বিশেষজ্ঞ এবং স্নেহাশীহ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানি-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার স্নেহাশীহ বড়ুয়া বলেন, সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা আগে থেকেই রয়েছে। জমির মালিকদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে সেই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। আবাসন ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, অতিরিক্ত করের বোঝা শেষ পর্যন্ত বাজারে ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর।
রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা দেখছে এনবিআর:
অন্যদিকে রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সরকারের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যমানের ভিত্তিতে কর হিসাব করা হলেও এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা গেলে রাজস্ব আরও বেশি হতে পারত। তবুও রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, এই নীতির প্রভাব মূলত বড় সম্পদ ও উচ্চমূল্যের সম্পত্তির ওপর পড়বে। ফলে সাধারণ বা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

