দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত টাকার মানে ধীরে ধীরে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে অবনতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে এই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দর প্রায় ৪৫ পয়সা বেড়েছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ ডলার কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা টাকার তুলনামূলক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার কেনা হয়েছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে। ওই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনে। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রাবাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং ডলারের ওপর বড় কোনো চাপ ছিল না।
পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায় এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আন্তঃব্যাংক লেনদেন শেষে প্রতি মার্কিন ডলারের দর দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এই দরে আগের তুলনায় বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়, যা টাকার মান কিছুটা কমে যাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতি ডলারে টাকার দর প্রায় ৪৫ পয়সা বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা কাট-অফ রেটে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে। এর আগের দিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৭০ পয়সা দরে ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে চলতি এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত ১২০ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করা হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৫ হাজার ৬১৩ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একজন ঊর্ধ্বতন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহে রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সা দরে ডলার কেনার জন্য ব্যাংকগুলোকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে নিলামে তুলনামূলক কম দামে ডলার কেনার মাধ্যমে বাজারে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ডলারের দর ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার আশপাশে স্থিতিশীল রাখাই নীতিগত লক্ষ্য।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের সরবরাহ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। ডলারের দর অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দামে ডলার কিনছে। এতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে ডলারের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে কিছু ব্যাংক তুলনামূলক বেশি দামে ডলার কিনেছে বলেও জানা গেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ডলারের দর আবার কিছুটা কমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তন হঠাৎ নয় বরং একাধিক চাপ একসঙ্গে কাজ করার ফল। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি।
তবে পুরো চিত্র একমুখী নয়। প্রবাসী আয় এবং রফতানি আয় বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা ঠেকাতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীল প্রবাহের কারণে ডলারের দর দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনে বা বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিময় হার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের ওঠানামা না হলেও ধীরে ধীরে একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান প্রবণতা এখনো উদ্বেগজনক না হলেও এটি সতর্কতার সংকেত দিচ্ছে। কারণ টাকার মান কমতে থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে এই চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। না হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আরও ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে গত দেড় মাসে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে টাকার মান ধীরে ধীরে কমেছে এবং ডলার তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

