২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের বিশ্বাস, বৃহৎ ভোক্তা বাজার, বিপুল তরুণ জনশক্তি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো আধুনিক করা, কর ও মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থাকে সহজ করা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কাজ চলছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল সেবা, ওষুধশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, আধুনিক বস্ত্র, স্বাস্থ্যসেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপুল পরিমাণ দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চেম্বারের সভাপতি রুপালী চৌধুরী মনে করেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে মানসম্মত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। গত অর্থবছরে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার। তুলনায় একই সময়ে ভারতে এসেছে ৩ হাজার ৮৮৯ কোটি ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২ হাজার ১৪৪ কোটি ডলার, ভিয়েতনামে ২ হাজার ৩৫ কোটি ডলার, কম্বোডিয়ায় ৫১০ কোটি ডলার এবং পাকিস্তানে ১৮৫ কোটি ডলার। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চেম্বার বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় নয়টি বড় প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, বাজারে প্রবেশ থেকে শুরু করে ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রয়োজনে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই বিনিয়োগকারীরা জটিলতার মুখে পড়েন।
সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দীর্ঘসূত্রতা। একটি ব্যবসার অনুমোদন পেতে সাধারণত ছয় থেকে বারো মাস সময় লাগে। জমির মালিকানা হস্তান্তরে গড়ে ২৬০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার খালাসের পর বের হতে আট থেকে দশ দিন লেগে যায়, যেখানে ভিয়েতনামে একই কাজ শেষ হয় মাত্র তিন থেকে চার দিনে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ সীমাবদ্ধ ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। মহেশখালীর ভাসমান গ্যাস পুনরায় গ্যাসীকরণ ইউনিটের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিড থেকে অতিরিক্ত ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এই ঘাটতির ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকার আমদানি করা যন্ত্রপাতি অলস পড়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু শিল্প উৎপাদনেই নয়, ব্যাংক খাতেও প্রভাব ফেলছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পখাতে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে এমজিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, গ্যাসের অভাব ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরও গ্যাস সংযোগ না থাকায় অনেক শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়ন আটকে আছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতে, দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা এখন জ্বালানি সংকট। ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সিমিন রহমান বলেন, আধুনিক শিল্পায়নের জন্য শুধু বিদ্যুৎ থাকলেই হবে না, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত জ্বালানি সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে।
এর পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। একটি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের ২৩টি পৃথক সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। উৎপাদনশীলতার বৈশ্বিক সূচকে দেশের অবস্থান ১০০ দেশের মধ্যে ৯৬তম। এছাড়া কাগজে-কলমে করপোরেট করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও বিভিন্ন কর ও চার্জ মিলিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর করের বোঝা ৪৩ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন। এতে বিনিয়োগের আকর্ষণ অনেকটাই কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে এই বাধাগুলো দূর করা সম্ভব। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।

