রাজধানীতে এক সেমিনারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতি চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্তে নেওয়া ঋণের প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তার ভাষ্য, আগের সরকার জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিয়ে নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতা ধরে রাখতে এই ঋণচুক্তিতে গিয়েছিল।
গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময় দেশের অর্থনীতি একটি নাজুক অবস্থায় পড়ে যায়। তবে প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, এই প্রবৃদ্ধি কোনো নীতিগত সংস্কারের ফল নয়; বরং প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ও দেশপ্রেমের প্রতিফলন।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কার, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, দুর্বল অর্থনীতির পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করাই এখন মূল লক্ষ্য।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি গুরুত্ব দেন অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর। তার মতে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। এ জন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন কার্যক্রম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ব্যাংক রেজুলেশন আইন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনে সবার জন্য সমান সুযোগ রাখা হয়েছে। কেউ যদি এটিকে সংবিধানবিরোধী মনে করেন, তবে আদালতে যাওয়ার পথ খোলা আছে।
সেমিনারে অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়া, আইএমএফের শর্তের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এখন বড় পরীক্ষা।
তিনি আরও জানান, দেশে আয় বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০১০ সালে ধনী-দরিদ্র আয়ের ব্যবধান ছিল ৩২ গুণ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৮১ গুণে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে তিনি বলেন, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল করলেই খেলাপি ঋণের সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর সুশাসন। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদ ও ঋণ ফাঁদের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে ঋণের সুদ পরিশোধই বাজেটের বড় ব্যয়খাতগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
শিল্পখাতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন শিল্পের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শিল্পনীতি অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখা জরুরি।
অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনাময় সমাধান হতে পারে। তবে কর কাঠামো ও ব্যবসায়িক সীমাবদ্ধতার কারণে এ খাত এখনো প্রত্যাশিতভাবে বিস্তৃত হচ্ছে না।

