জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটজনক হয়ে উঠছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে ২৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এতে দিনের বড় অংশ বিদ্যুৎবিহীন কাটাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগও বাড়ছে কয়েক গুণ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চট্টগ্রাম জোনের তথ্য বলছে, গত ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৮৪ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াটে। বিপরীতে সরবরাহ ছিল সকাল ১১টায় ১ হাজার ৯৫ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট। এই হিসাবে দিনে গড়ে লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮১ মেগাওয়াট।
জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ রয়েছে। এতে উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে রাউজানের ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্র। পাশাপাশি পানিস্বল্পতার কারণে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক ইউনিটও বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সচল কেন্দ্রগুলো থেকেও সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা সংকট আরও তীব্র করছে।
নগরের বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। চকবাজার, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
লোডশেডিংয়ের প্রভাবে পানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। ওয়াসার সেবায় সমস্যা দেখা দেওয়ায় অনেক এলাকায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম কলেজ রোডের বাসিন্দা নুসরাত জাহান বলেন, রাতে শিশুদের ঘুম পাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। এভাবে চলতে থাকলে বাসায় থাকা কষ্টকর হয়ে উঠছে।
কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দা উম্মে হাবিবা বলেন, দিনে অফিসের কাজ শেষে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে এবং কাজের ওপরও প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। চলমান জ্বালানি সংকট এই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অফিস সময় কমানো এবং শপিং মল দ্রুত বন্ধ রাখার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম পিডিবির সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহমিদা জামান বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। এতে লোডশেডিং বেড়েছে। তিনি জানান, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই লোডশেডিংয়ের মাত্রা ওঠানামা করছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা কম বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

