বাংলাদেশের বন্ড বাজার এক সময়কে ধরা হতো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে। ব্যাংকের কম সুদের আমানত আর শেয়ারবাজারের অস্থিরতার মাঝামাঝি একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস হিসেবে এটিকে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই ধারণার ওপর ভর করেই ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা কোম্পানি এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিল।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আস্থার ভিত এখন প্রশ্নের মুখে। একের পর এক বন্ডে সুদ পরিশোধ বন্ধ, মেয়াদ শেষ হলেও মূলধন ফেরত না আসা এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আইনি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ দুর্বল আইন প্রয়োগ, বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ দুর্বলতা। এর ফলে বাজারে আস্থার ভিত্তি ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
কর্পোরেট বন্ড চালুর সময় এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যে, এটি হবে তুলনামূলক নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য আয়ের উৎস। নির্দিষ্ট সময় পর নিয়মিত কুপন বা সুদ প্রদান এবং মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা—এই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই বিনিয়োগকারীরা অংশ নেয়।
এই ধারণায় ভর করে ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হলেও মূলধন ফেরত আসছে না, আবার কোথাও কোথাও কুপন বা সুদও বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সংকটের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ রিজেন্ট স্পিনিং মিলস। চট্টগ্রামভিত্তিক হাবিব গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালে ২০০ কোটি টাকার একটি কর্পোরেট বন্ড ইস্যু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা সম্প্রসারণ। বন্ডটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে। কিন্তু সেই সময়ের পর থেকে বিনিয়োগকারীরা এখনো মূলধন ফেরত পাননি। এই বন্ডে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট এবং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)সহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছিল।
২০২০ সালের জুনে প্রতিষ্ঠানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিফল্ট ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তবে অর্থ উদ্ধারের আইনি পদক্ষেপ শুরু হয় আরও অনেক পরে—২০২৪ সালের আগস্টে, অর্থাৎ প্রায় চার বছর বিলম্বে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে হাবিব গ্রুপের আর্থিক অবস্থাও পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ অচল হয়ে পড়ে এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা দেশত্যাগ করেন। ফলে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বেক্সিমকো সুকুক: দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির আরেক চিত্র:
একই ধরনের ঝুঁকির চিত্র দেখা যাচ্ছে বেক্সিমকোর গ্রিন সুকুক আল ইস্তিসনা’তে। এই বন্ডে প্রায় ৯৪ শতাংশ অর্থ এখনো পরিশোধ হয়নি। এর মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে আরও পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গ্রুপের আর্থিক অবস্থার অবনতি এতটাই হয়েছে যে ২০২৬ সালের মধ্যে মূলধন ফেরত দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। বর্তমানে বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান কারাগারে থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আংশিক লাভের কিস্তি পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।
আইসিবির আরেকটি বড় বিনিয়োগ রয়েছে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা-র কনভার্টেবল বন্ডে। ২০১৭ সালে ইস্যু করা এই ৩২৫ কোটি টাকার বন্ডে পুরো অর্থই আইসিবি সাবস্ক্রাইব করেছিল। বন্ডটি হোটেল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং পুরনো ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। এতে সম্পত্তি বন্ধকও ছিল। তবে করোনাকালীন সময়কে কারণ দেখিয়ে কোম্পানি কিস্তি পরিশোধ বন্ধ রাখে এবং বিভিন্ন সময়ে ছাড় চায়। বিনিয়োগের মেয়াদ প্রায় শেষ হলেও এখনো বড় অংশ ফেরত আসেনি, ফলে এই অর্থও দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে।
ব্যাংক খাতের বন্ডে নতুন ধরনের ঝুঁকি:
কর্পোরেট খাতের বাইরে এখন ব্যাংক খাতের সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। চারটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার ১০ কোটি টাকার বন্ড বর্তমানে কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের একাই প্রায় ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা আটকে আছে। ব্যাংক একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার কারণে এসব অর্থ ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত মূলধন ফেরত পাবেন, তবে এতে সময় লাগতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই।
আইসিবির চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বন্ড অনেক সময় নিরাপদ মনে করা হলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা সঠিক নয়। বিশেষ করে কর্পোরেট বন্ডে ঝুঁকি থেকে যায়। তার মতে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে এবং ডিফল্টের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিইও শহীদুল ইসলাম মনে করেন, বন্ড বাজারের মূল সমস্যা হলো দুর্বল আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সময়মতো অর্থ না ফেরত দেওয়া। তার মতে, স্বচ্ছ আর্থিক তথ্য ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে বন্ড ইস্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, অতীতেও দুর্বল আর্থিক অবস্থার প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২৪টি প্রতিষ্ঠান মোট প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে আগের কমিশন প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, প্রায় ২৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে শেয়ারবাজারে ১৬টি বন্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা (জুন ২০২৫ অনুযায়ী)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ড বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডিফল্ট হওয়া প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস না থাকা। এতে বাজারে স্বচ্ছতা কমে যাচ্ছে এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি কুপন মিস করাও গুরুতর ডিফল্ট হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।
বিএসইসি বলছে, কোনো বন্ড ডিফল্ট হলে প্রথমে ট্রাস্টির দায়িত্ব হলো বিষয়টি কমিশনকে জানানো এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যায়।
রিজেন্ট স্পিনিংয়ের ক্ষেত্রে শুরুতে নিয়মিত কুপন পরিশোধ হলেও পরবর্তীতে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে সি পার্লের ক্ষেত্রে মহামারির প্রভাবকে কারণ দেখিয়ে অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখা হয়। দুই ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বন্ড বাজার এখন গভীর আস্থার সংকটে। একদিকে বিনিয়োগকারীরা অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন, অন্যদিকে বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দুর্বল নজরদারি, বিলম্বিত বিচার এবং অনিয়ম দূর করে কীভাবে এই বাজারে আবার আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।

