ঢাকার ফকিরাপুলসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে আন্তজেলা পরিবহনে জ্বালানিসংকটের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা দিচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধি, বাসের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং নির্ধারিত শিডিউল ভেঙে পড়ার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুরো পরিবহন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ফকিরাপুলের হানিফ পরিবহনের কাউন্টারম্যান বাবুল মিয়া জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভাড়ায় পড়েছে। তার ভাষায়, ঢাকা–মৌলভীবাজার রুটে আগে ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা, যা এখন বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এই ভাড়া সমন্বয় শুধু একটি রুটে সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য রুটেও ধীরে ধীরে একই চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে বাসের সংখ্যা কমিয়ে আনছে বলেও জানা গেছে। মারছা পরিবহন, আইকনিক পরিবহনসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও বরিশাল রুটে বাসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ইমপেরিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে, তাদের বিভিন্ন রুটে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক বাসই চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এনা পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মামুন জানান, ডিজেল সংকটে নির্ধারিত সময়সূচি প্রায় ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস দেড় থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। এমনকি নির্ধারিত সময়ে তেল না পাওয়ায় কিছু বাস একেবারেই ছাড়তে পারেনি। এতে যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠাতে হয়েছে, যা ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।
রয়েল পরিবহনের কর্মীরা জানান, পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় ৯০ লিটারের বদলে ৪০ থেকে ৫০ লিটার জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু পেট্রলপাম্প থেকে তেল পেতে অতিরিক্ত অর্থ বা ‘টিপস’ দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে একটি বাসের পূর্ণ ট্রিপ সম্পন্ন করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব যাত্রী পরিবহনেও পড়ছে। কিছু পরিবহন যেমন লন্ডন এক্সপ্রেস যাত্রী কমে যাওয়ায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম দামে সেবা দিচ্ছে। তবে দক্ষিণবঙ্গগামী রুটে, বিশেষ করে গুলিস্তান এলাকায় যাত্রী চাপ এখনো বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, চাহিদা কমেনি বরং সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পরিবহন খাতে দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে জ্বালানির সীমিত সরবরাহে পরিবহন সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বাড়ায় ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের খরচ বাড়ছে, আর মালিকদের ঝুঁকিও বাড়ছে। রবি পরিবহনের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শুধু সেবা নয়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিও হুমকির মুখে পড়বে। এমনকি কর্মীদের বেতন দেওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পর ভাড়া বৃদ্ধির দাবি আরও জোরালো হয়েছে। প্রায় দেড় মাসের জ্বালানিসংকটের পর বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ১৮ এপ্রিল রাত থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে। এতে পরিবহন খাতে ব্যয় আরও বেড়েছে।
এর আগে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল, যা ছিল প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি। পরে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা কমিয়ে ১০০ টাকায় আনা হয়। সর্বশেষ ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ার পর পরিবহন মালিকরা নতুন ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন। বাস ও ট্রাক মালিকদের সংগঠনগুলোর মতে, নতুন দামে জ্বালানি কিনে পুরোনো ভাড়ায় পরিবহন চালানো আর সম্ভব নয়।
দূরপাল্লার বাস ভাড়া নির্ধারণে ২০২২ সালে মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৮০ পয়সা প্রস্তাব করা হলেও সরকার তা গ্রহণ না করে ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করে। পরে ২০২৫ সালের ১৬ জুন তা সমন্বয় করে ২ টাকা ১২ পয়সা করা হয়।
এবার নতুন প্রস্তাবে মালিকরা বলছেন, বর্তমান ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রতি কিলোমিটার ৪ টাকা ৫ পয়সা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র জানায়, আগে থেকেই প্রতি কিলোমিটার ৩ টাকা ৭৫ পয়সার প্রস্তাব প্রস্তুত ছিল, নতুন জ্বালানি দামের কারণে তা সংশোধন করা হচ্ছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাস মালিক জানান, শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, ২০২২ সালে যে চাকার জোড়া ৫০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৭৪ থেকে ৮০ হাজার টাকা। একইভাবে আগে ১ হাজার ২০০ টাকার যন্ত্রাংশ এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাসের চেসিসের দামও ২৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩৬ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, আর বডি নির্মাণ খরচ ১১ লাখ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদ ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশ হওয়ায় কিস্তির চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, তেলের দাম বাড়ায় এখন ভাড়া সমন্বয় না করলে পরিবহন খাত টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তিনি জানান, যাত্রীদের ভোগান্তি কমিয়ে একটি বাস্তবসম্মত ভাড়া নির্ধারণের জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্রুত বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আজকালের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির অনিশ্চয়তায় দেশের আন্তজেলা পরিবহন খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সমাধান না হলে এর প্রভাব যাত্রীসেবা ছাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

