আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের করনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, করদাতাদের “গ্রাহক” হিসেবে যথাযথভাবে বিবেচনা না করে শুধুমাত্র করহার বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে—বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ফারাকের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তৈরি হওয়া অনেক করনীতি মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ফলে সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও মনে করেন, করনীতি প্রণয়নের আগে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তার মতে, কর আদায় ও নীতি নির্ধারণ কার্যক্রম আলাদা করা হলে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়তে পারে।
এছাড়া তিনি একটি স্থায়ী পরামর্শক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমের সদস্যরা থাকবেন। এই কমিটি নিয়মিতভাবে করনীতির প্রভাব মূল্যায়ন ও আলোচনার সুযোগ পাবে বলেও তিনি মত দেন। তার মতে, বাজেট প্রস্তাবের সময়সীমাও এগিয়ে এনে ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রস্তুত করা হলে নীতিগত সমন্বয় আরও কার্যকর হতে পারে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া উচ্চ করহারের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, অতিরিক্ত করহার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দেয় এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। তিনি বলেন, সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে চাইলেও সেটি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্জন করা উচিত। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আন্তর্জাতিক তুলনা টেনে বলেন, কিছু প্রতিবেশী দেশে করহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেখানে করজাল বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের তুলনায় কার্যকর রাজস্ব সংগ্রহে সহায়তা করছে। তার মতে, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশন বাড়ানো হলে হয়রানি কমবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ আরও টেকসই হবে।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেসলের বাংলাদেশ শাখার কর্মকর্তা দেবব্রত চৌধুরী বলেন, শুধু কর বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির ধারণা কার্যকর নয়। তার মতে, এতে পণ্যের দাম বাড়ে, ভোক্তার চাহিদা কমে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি করদাতাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন এবং বলেন, করদাতারা আসলে অর্থনীতির অংশীদার, শুধুমাত্র রাজস্ব সংগ্রহের উৎস নয়।
এমসিসিআইর ট্যাক্স ও ট্যারিফ কমিটির সভাপতি হাসান মাহমুদ বলেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়লেও কর রিটার্ন দাখিলের হার তুলনামূলকভাবে কম, ফলে নিয়মিত করদাতাদের ওপরই অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
অন্যদিকে, শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এনবিআরের উচ্চপর্যায়ে কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলির কারণে নীতিগত আলোচনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, যা কর সংস্কারের গতি কমিয়ে দেয়।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা সরকারের বিভিন্ন নীতির মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়ও তুলে ধরেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সরকার উৎসাহ দিলেও সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারি আমদানিতে উচ্চ কর আরোপ রয়েছে। একইভাবে পানিকে অপরিহার্য পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এর ওপর কর আরোপের ফলে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের বৈপরীত্য বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
কর সংস্কারের প্রস্তাবনা: এমসিসিআই আসন্ন বাজেটের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে—
- তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২০ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২৫ শতাংশ নির্ধারণ
- করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা করা
- উৎসে কর কর্তনের হার কমিয়ে ৩ শতাংশে নামানো
- রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ
সংগঠনটির মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে এবং কর ব্যবস্থায় আস্থা বাড়বে। সেমিনারে বক্তাদের অভিন্ন মত ছিল, করনীতি যদি ব্যবসাবান্ধব, স্বচ্ছ এবং পূর্বানুমানযোগ্য না হয়, তবে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামোর প্রয়োজন এখনই অত্যন্ত জরুরি।

