রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কমে এসেছে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, এই তিনটি কারণ একসঙ্গে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫-এ বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে নীতিগত কড়াকড়ি ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রধান আর্থিক মাধ্যম হলেও দুর্বল শাসনব্যবস্থা, সীমিত তদারকি এবং মূলধনের ঘাটতির কারণে এই খাত কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাতও চাপের মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য বাংলাদেশকে ২০২৫ সালে ৫০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে এডিবি। এই অর্থ তদারকি ব্যবস্থার উন্নয়ন, শাসন কাঠামো শক্তিশালী করা, সম্পদের মানোন্নয়ন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যও রয়েছে।
এডিবি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা জোরদারে তারা কাজ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য মোট ৫২১ কোটি ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঋণ ও অনুদান হিসেবে ২৫৭ কোটি ডলার সরাসরি সহায়তা পাওয়া যাবে। বাকি অর্থ বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
আঞ্চলিক চিত্রে এডিবি বলেছে, ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মোট অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। এর বাইরে উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে আরও ১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অর্থায়নের মাধ্যমে ৩৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হতে পারে ১৮ কোটিরও বেশি মানুষ।
অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দে দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই অঞ্চলের জন্য ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বরাদ্দ রয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার এবং মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার জন্য রাখা হয়েছে ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগে আর্থিক খাত, পরিবহন ও সরকারি ব্যবস্থাপনা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। সরকারি খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অংশের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, মূলধন না বাড়িয়েই অর্থায়ন সক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে এডিবি। একই সঙ্গে জ্বালানি নীতিমালা হালনাগাদ, ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করা এবং খনিজভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলে নতুন গতি আনতে পারে।

