বিশ্বের উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো অনেকটাই অনুন্নত অবস্থায় রয়েছে। ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হলেও প্রায় পাঁচ দশক পরও এই বাজার জাতীয় স্থায়ী মূলধন গঠনে খুবই সীমিত ভূমিকা রাখতে পেরেছে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারের সামষ্টিক অবদান মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি হারানো সুযোগ নয়, বরং একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এই দুর্বলতা করপোরেট খাতের অর্থায়নের ভারসাম্য নষ্ট করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নকে একটি সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ উৎসের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে, যা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট ইস্যুকৃত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, যা প্রায় ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের সমান। এর বিপরীতে দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠন দাঁড়িয়েছে ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বছরে গড়ে ওঠা পুরো ইকুইটি বাজার জাতীয় বিনিয়োগের মাত্র ৬ শতাংশের মতো অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে বাজার মূলধনের হার এখন মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এই হার ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর খেলাপি ঋণ সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কায় এটি ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোও বাংলাদেশের তুলনায় পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থায়নে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ফলে এশিয়ার বড় কোনো উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভূমিকা এখনো অত্যন্ত সীমিত বলেই দেখা যায়। খর্বিত ইকুইটি বাজারের বিপরীতে বাংলাদেশের করপোরেট অর্থায়নে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে অতিমাত্রায় ব্যাংকনির্ভরতা। এই কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো শিল্প খাতে মোট ৭ লাখ ৬৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এটি মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে এটি গত পাঁচ দশকে পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত মোট অর্থের সাত গুণেরও বেশি। এই বিপুল ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা হলো মেয়াদি ঋণ, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আদর্শ অর্থনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী এমন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন আসা উচিত ইকুইটি, বন্ড বা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে; স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক আমানত থেকে নয়।
এই মেয়াদগত অসামঞ্জস্যই বাংলাদেশের করপোরেট অর্থায়নের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো সাধারণত এক থেকে দুই বছরের আমানত সংগ্রহ করে। সেই আমানতই পরবর্তীতে শিল্প খাতে ১০ থেকে ১৫ বছরের প্রকল্পে ঋণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকল্প ব্যর্থ হলে কিংবা সুদের হার বেড়ে গেলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়। এই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১ শতাংশই শিল্প খাতকেন্দ্রিক। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
মূল সমস্যা হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এমন একটি দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত পুঁজিবাজারের কাজ হওয়ার কথা। এর ফলে শুধু ব্যাংক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে করপোরেট খাতও। ব্যাংক ঋণ পাওয়া গেলেও তা এখন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইকুইটি অর্থায়নে নির্দিষ্ট সুদ বা কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে না। এতে ঝুঁকি বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তার মধ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং একক চাপ তৈরি হয় না।
এই বাস্তবতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নতুন প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের মধ্যে ৬০:৪০ অনুপাতের একটি ভারসাম্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, এমন কাঠামো গড়ে উঠলে মূলধনের গড় ব্যয় কমবে, সামগ্রিক আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং বিনিয়োগের মেয়াদ প্রকৃত প্রকল্পের সময়সীমার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। পুঁজিবাজার সম্প্রসারণ না হওয়ার পেছনের কারণগুলো নতুন নয়। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান এবং কাঠামোগতভাবে গভীরভাবে প্রোথিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে সামনে আসে আস্থার সংকট।
গত দেড় দশকে ১৪৯টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেছে। এসবের বড় অংশের অনুমোদন হয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিতর্কিত খায়রুল হোসেন নেতৃত্বাধীন সময়কালে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহারের বদলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ার কারসাজির অভিযোগও উঠেছে। আরও গুরুতর অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাক-আইপিও প্লেসমেন্ট শেয়ার উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। পরে তালিকাভুক্তির পর অতিমূল্যায়িত দামে সেগুলো বিক্রি করে তারা মুনাফা তুলে নেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদের মতে, কয়েকজন অসাধু উদ্যোক্তার কর্মকাণ্ডও পুরো বাজারের ওপর বহুগুণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাজারে নতুন কোনো আইপিও আসেনি, যা নজিরবিহীন পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র নয়টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল।
বর্তমান মন্দাবাজার পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা কম দামে শেয়ার বিক্রির ঝুঁকি এড়াতে তালিকাভুক্তি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের পর কঠোরতর প্রকাশনা ও স্বচ্ছতা সংক্রান্ত বিধি তালিকাভুক্তির ব্যয় বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক উত্তেজনাও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা পূর্বের সীমিত পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান রয়েছে পারিবারিক ব্যবসা সংস্কৃতির প্রভাব।
বাংলাদেশের করপোরেট খাত এখনো মূলত পরিবারনির্ভর। মালিকানা হ্রাস বা অংশীদারিত্ব ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের অনীহা প্রবল। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইফতেখার আলমের মতে, অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, প্রকাশ্য কোম্পানি হওয়ার খরচ—যেমন তথ্য প্রকাশ, সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক তদারকি—এর তুলনায় সুবিধা কম, বিশেষ করে যখন ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দেশের পুঁজিবাজারের অগভীর ও একমাত্রিক কাঠামো। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৬৪৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে মাত্র ৩৬০টি কোম্পানি। এর মধ্যে ৩২টি উৎপাদন বন্ধ এবং ৩৮টি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে অব্যাহত কার্যক্রম নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাকি অংশের মধ্যে রয়েছে ট্রেজারি বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবেঞ্চার এবং মাত্র ১৬টি করপোরেট বন্ড, যা একটি বড় অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।
বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান পুঁজিবাজারগুলো বহুমাত্রিক। সেখানে বন্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটি, অবকাঠামোভিত্তিক সিকিউরিটাইজড পণ্যসহ নানা ধরনের আর্থিক উপকরণ থাকে। বাংলাদেশের বাজার কার্যত ইকুইটিনির্ভর এবং সেটিও সীমিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর প্রভাব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণেও পড়েছে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিট বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক ধারায় প্রবেশ করে, যা বাজারের প্রতি আস্থাহীনতারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে নিট বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগে ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা গেছে। এর ফলে বিদেশি মূলধন কার্যত বাজার থেকে সরে যাচ্ছে। এই প্রবণতা পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে। এসব সমস্যার সমাধান চাইলে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। বরং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, করনীতি এবং বাজার স্থাপত্য—এই তিন ক্ষেত্রে সমন্বিত ও পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।
প্রথমত, আস্থা পুনর্গঠনে প্রয়োগযোগ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জরুরি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন নিয়ম-কানুন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শুধু বিধি কঠোর করাই যথেষ্ট নয়। অতীতে সংঘটিত কারসাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, সময়বদ্ধ এবং বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দশকের বাজার অপরাধের কার্যকর বিচার না হলে কোনো প্রক্রিয়াগত সংস্কারই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে সংগৃহীত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে আইপিও অর্থের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সীমা ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই সীমা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কারণ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যখন ১২ শতাংশের বেশি, তখন উচ্চব্যয়ী ঋণ ইকুইটির মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন করা গেলে কোম্পানির মূলধন ব্যয় কমে, ব্যালান্সশিট শক্তিশালী হয় এবং ব্যাংক খাতের চাপও হ্রাস পায়। করপোরেট ঋণভার কমানোকে তাই উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, প্রকৃত বন্ডবাজার গঠন এখন সময়ের দাবি। ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে মাত্র ১৬টি করপোরেট বন্ড থাকা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্যাংক আমানতের সঙ্গে করসমতা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কার্যকর গৌণবাজার তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য ইয়েল্ড কার্ভ গঠনের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবকাঠামো অর্থায়নে সিকিউরিটাইজেশন ব্যবহারের বিষয়টি দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকলেও এখন সেটিকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সরকারের অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন।
চতুর্থত, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ও নীতিগত প্রণোদনা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের পার্থক্য সীমিত হওয়ায় পরিবারনির্ভর কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হয় না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অর্থবহ করছাড়, বেনামি মালিকানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কঠোর সুশাসন নীতি চালু করলে উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে।
পঞ্চমত, বড় প্রকল্পে পুঁজিবাজার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি প্রকল্প অর্থায়নে ইকুইটি, বন্ড বা সুকুকের মতো পুঁজিবাজারভিত্তিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি তারল্য চাপ কমতে পারে। এটি এখন আর বিকল্প ভাবনা নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবশেষে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পেনশন ফান্ড, দীর্ঘদিন বিলম্বিত সর্বজনীন পেনশন স্কিম, বীমা খাতের রিজার্ভ এবং সুশাসিত মিউচুয়াল ফান্ড—এসবই পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হতে পারে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হলে নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা, করনিরপেক্ষতা এবং ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সংকট শুধু শেয়ারবাজারের সীমিত সমস্যার মধ্যে আটকে নেই। এটি মূলত জাতীয় অর্থায়ন কাঠামোর গভীর সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ বজায় রেখে শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গঠন এবং ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চাপ কমানোও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে বিদ্যমান আর্থিক হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকছে না।
এশিয়ার সফল প্রায় সব অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার করপোরেট অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় উৎস হিসেবে কাজ করেছে। সেখানে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার একসঙ্গে অর্থায়নের ভারসাম্য তৈরি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে ব্যাংক ব্যবস্থা এমন একটি ভার বহন করছে, যার জন্য সেটি কাঠামোগতভাবে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে ইকুইটি বাজার প্রায় পাঁচ দশক পরও মোট বিনিয়োগের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ অর্থায়নে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা স্বাভাবিকভাবে নিজে থেকে ভাঙার সম্ভাবনা খুব কম। ফলে প্রশ্নটি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং নীতিগত ও রাজনৈতিক। বর্তমান সরকারের কি সেই রাজনৈতিক সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা রয়েছে, যা পূর্ববর্তী সরকারগুলো কার্যকরভাবে দেখাতে পারেনি—এটাই এখন মূল বিবেচ্য বিষয়।

