আর্থিক সংকটে পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রথমেই আঘাত পড়ে পরিকল্পনার যুক্তির ওপর। শুরু হয় বাজেট পুনর্মূল্যায়ন। প্রধান নির্বাহী তখন পর্যালোচনার ঘোষণা দেন, আর অর্থ বিভাগ তুলে ধরে কঠিন বাস্তবতার চিত্র। এরপর প্রতিটি বিভাগ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা দিতে থাকে।
বিপণন বিভাগ জানায়, খরচ কমালে ব্র্যান্ড ইমেজ, বিক্রি এমনকি সামগ্রিক মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপারেশন বিভাগ সতর্ক করে দেয়, সামান্য ব্যয় কমলেই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মানবসম্পদ বিভাগ আবার আশঙ্কা প্রকাশ করে, এতে প্রতিষ্ঠান সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং কর্মীরা দ্রুতই চাকরি পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকবে।
সব বিভাগের কাছ থেকে দীর্ঘ যুক্তি শোনার পর সিদ্ধান্ত আসে প্রায় একই ধরনের—সবাই সমানভাবে বাজেট কাটছাঁটের আওতায় আসবে। এটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত করপোরেট সমাধান, যেখানে কৌশলের চেয়ে সংখ্যার হিসাবই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতেও এমনই এক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, বিশেষ করে ইরান ঘিরে সংঘাতের প্রভাবে, সরকারকে সহজ রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সমাধান হলো—সব জ্বালানির দাম সমানভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এটি দেখতে সহানুভূতিশীল ও সিদ্ধান্তমূলক মনে হলেও বাস্তবে এটি গভীর কৌশলগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, যদি না এতে ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির গুরুত্ব ও ব্যবহার বিবেচনা করা হয়। প্রশ্ন হলো—কোন জ্বালানি অপরিহার্য, কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে এবং কোন খাতে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বাংলাদেশের উচিত জ্বালানির দাম নয়, মানুষের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেচ, পণ্য পরিবহন, বাস ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ডিজেল এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের পেট্রোল এক ধরনের জ্বালানি নয়। তবুও সব ধরনের জ্বালানিকে সমানভাবে ভর্তুকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা বাস্তব অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন কৃষক, একজন বাসচালক এবং একজন ব্যক্তিগত এসইউভি ব্যবহারকারীকে রাষ্ট্রের কাছ থেকে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বরং পণ্যে নয়, ব্যবহারকারীর ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো সীমান্ত পরিস্থিতি। যখন অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম আশপাশের দেশের তুলনায় কম থাকে, তখন সেই ভর্তুকি দীর্ঘস্থায়ী থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে তা অবৈধ পাচারের পথ তৈরি করে। ফলে যে নীতি জনসুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়, তা শেষ পর্যন্ত অপব্যবহার ও চোরাচালানের সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি অর্থনৈতিক সহায়তার বদলে এক ধরনের ব্যয়বহুল আত্মপ্রতারণায় পরিণত হয়।
সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। যেসব খাত অর্থনীতি ও সমাজে সরাসরি প্রভাব ফেলে, সেখানে সহায়তা কেন্দ্রীভূত করা উচিত। যেমন—গণপরিবহন, কৃষি, পণ্য পরিবহন, মৎস্য খাত এবং জরুরি সেবা। এসব খাতে ব্যবহৃত ডিজেল অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের পেট্রোল ও অকটেন একই মাত্রার সহায়তা পাওয়ার যৌক্তিকতা কম।
বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হলো প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক শক্তি। অনেক দেশের তুলনায় এখানে সিএনজি অবকাঠামো ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাস, থ্রি-হুইলার, বাণিজ্যিক যান ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে গ্যাসে রূপান্তরের দিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু জ্বালানি ব্যয়ই কমবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে চাপও হ্রাস পাবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো চাহিদা ব্যবস্থাপনা। সবচেয়ে কার্যকর ভর্তুকি সেই, যা জ্বালানির মোট ব্যবহার কমিয়ে আনে। উন্নত পরিবহন পরিকল্পনা, রুট অপ্টিমাইজেশন, অপ্রয়োজনে যান চলাচল কমানো, রাইড শেয়ারিং, কার্যকর গণপরিবহন এবং প্রয়োজনে দূরবর্তী কাজের ব্যবস্থাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। এগুলো শুধু ব্যয় কমায় না, বরং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনে।
সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও বাস্তবায়নযোগ্য। বাস কোম্পানিগুলো বাজারমূল্যে জ্বালানি কিনতে পারে, তবে নির্দিষ্ট খাতে ভর্তুকি আলাদাভাবে দেওয়া সম্ভব। বিআরটিএর তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে যানবাহনভিত্তিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কৃষকের জন্য মৌসুমি সহায়তা, মৎস্যজীবীদের জন্য ডিজিটাল ভাউচার এবং নিম্ন আয়ের যাত্রীদের জন্য পরিবহন সহায়তা—এসব ব্যবস্থা লক্ষ্যভিত্তিক নীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। এভাবে অপচয় কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে সেই পদক্ষেপ আবেগনির্ভর হলে চলবে না, হতে হবে কৌশলভিত্তিক। সব ব্যবহারকারীর জন্য সমানভাবে সহায়তা বিতরণ করা আপাতদৃষ্টিতে ন্যায্য মনে হলেও বাস্তবে এটি নীতিগত দুর্বলতা ঢাকার একটি সহজ উপায় মাত্র।
লেখক: মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, বিল্ডকন কনসালটেন্সি লিমিটেড এবং বিল্ডনেশনস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা।

