দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কিন্তু সেই তুলনায় বিদ্যুতের বিক্রিমূল্য না বাড়ায় প্রতি বছর বাড়ছে আর্থিক ঘাটতি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আইপিপিগুলোর কারণে এই চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত কয়েক বছরে নতুন কয়েকটি আইপিপি বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে কিন্তু চাহিদা কম থাকা ও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্রই নিয়মিত পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। তারপরও এসব কেন্দ্রকে চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির বড় অংশ এখন শুধু এই চার্জ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় বিদ্যুৎ ভর্তুকির বড় অংশ জ্বালানি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হতো কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির অর্থ প্রায় পুরোপুরি সেদিকেই ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৮ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১২৭ কোটি টাকায়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিপিডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। বিপরীতে বিক্রি থেকে আয় হতে পারে ৭২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এতে সম্ভাব্য ঘাটতি হবে ৬২ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। এই ঘাটতির বিপরীতে সরকার থেকে ভর্তুকি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৪৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভর্তুকির প্রায় পুরোটা এখন ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য ভর্তুকির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮২১ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধেই ব্যয় হবে ৪২ হাজার ৬১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ভর্তুকির ৯৭ শতাংশের বেশি চলে যাবে এই খাতে।
গত কয়েক বছরে এই প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকির ৯১ শতাংশ ছিল ক্যাপাসিটি চার্জ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৪৬ শতাংশ।
অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিপিডিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় হয়েছে ১১ টাকা ৭৮ পয়সা। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ১০ টাকা ৯৬ পয়সা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩ পয়সা।
কিন্তু বিদ্যুতের বিক্রিমূল্য সেই হারে বাড়েনি। বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ৭ টাকা ৪ পয়সা। সমন্বয়ের পর যা দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ৯৯ পয়সা। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে এই হার ছিল ৬ টাকা ২০ পয়সা। তখন উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রিমূল্যের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকায় লোকসানও সীমিত ছিল।
তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও বিক্রিমূল্য তুলনামূলক কম হারে বাড়ায় বিপিডিবির লোকসান এখন বড় আকার ধারণ করেছে। তবে পুরো ঘাটতি সরকার ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করছে না। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৬ টাকা ৯৯ পয়সা। এটি ১২ টাকা ৯১ পয়সা করা হলে আর কোনো ভর্তুকি প্রয়োজন হবে না। সেক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে দাম বাড়বে ৫ টাকা ৯২ পয়সা বা প্রায় ৮৫ শতাংশ।
এছাড়া বিকল্প হিসেবে আরও দুটি প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। এর মধ্যে একটি হলো ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা বা ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশ দাম বৃদ্ধি। অন্যটি ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫০ পয়সা বা ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রস্তাব কার্যকর হলে ঘাটতি কমবে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। আর দেড় টাকা বাড়ানো হলে ঘাটতি কমতে পারে ১৬ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব নিয়ে আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

