দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে আগে বাতিল হওয়া ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প আবারও চালু করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা আইনগত ও বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রতিবেদন দেবে।
জানা গেছে, গত ৬ মে জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ কমিটি গঠন করে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিমকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মাহাফুজার রহমান। রেজাউল করিম জানিয়েছেন, কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর আইনি অবস্থান, বাস্তব অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ খাতের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে।
সরকারি সূত্র বলছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন’-এর আওতায় এসব প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের এলওআই দেওয়া হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন কোম্পানি জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন এবং অবকাঠামো প্রস্তুতির মতো কাজেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনে। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টের একটি রায়কে ভিত্তি করে এসব প্রকল্পের এলওআই বাতিল করে দেয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই তড়িঘড়ি করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সব প্রকল্প একসঙ্গে বাতিল করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চিন্তাও করেছিলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরকার চাইলে প্রকল্পগুলো পুনরায় আলোচনা করতে পারত। কোনো অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু সব প্রকল্প একসঙ্গে বাতিল করা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে পারবে। সেই সুযোগ ব্যবহার না করে সরাসরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি।
মন্ত্রণালয় ও বিনিয়োগকারী সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ জড়িত ছিল। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারত। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের দাবি, প্রকল্প উন্নয়নের প্রাথমিক ধাপে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এর বড় অংশই বিদেশি ঋণ ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এসেছে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আরও প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রক্রিয়াধীন ছিল।
চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীরা এসব প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অন্তত ১৫টির বেশি প্রকল্পের উদ্যোক্তা শতভাগ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, ৩২০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এবং ২৫ মেগাওয়াট বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের পেশাজীবী সাকির আহমেদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। তার ভাষায়, আদালত আগেই জানিয়েছিলেন যে চলমান প্রকল্পগুলো প্রয়োজনে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সরাসরি বাতিলের নির্দেশ দেননি। তিনি আরও বলেন, এলওআইয়ের শর্ত অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের পর পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী সে অনুযায়ী বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ও করেন। কিন্তু উদ্যোক্তা বা আদালতের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এলওআই বাতিল করায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানা গেছে, পরবর্তীতে সরকার ৫৩টি নতুন টেন্ডার আহ্বান করলেও প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের গতি কমে যায়।
হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন’-এর দুটি ধারা বাতিল ঘোষণা করেন। এর একটি ধারায় টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুযোগ ছিল। অন্য ধারায় চুক্তিসংক্রান্ত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে একইসঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে অনুমোদিত ও চলমান প্রকল্পগুলো অস্থায়ীভাবে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সৎ উদ্দেশ্যে যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, সেগুলো বহাল থাকতে পারে।
কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ১৮ নভেম্বর বিপিডিবি ৩১টি কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে জানায়, তাদের প্রকল্প আর বিবেচনা করা হবে না এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ আহসানুল করিমের মতে, আদালত প্রকল্পগুলোকে অস্থায়ী বৈধতা দিলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা আইনগতভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান সরকারের নতুন এই পর্যালোচনা উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থবিরতা কাটাতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

