আসন্ন জাতীয় বাজেটে রপ্তানি নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে সরকারের ভেতরে। বর্তমানে এই করের হার ১০ শতাংশ হলেও তা দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে একই সময়ে দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বাড়তি চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ খাত।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনার জন্য সরকার ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আগামী অর্থবছরেও যদি একই হারে প্রণোদনা অব্যাহত থাকে, তাহলে উৎসে করের হার বাড়িয়ে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারে বলে হিসাব করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এনবিআরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে এনবিআরের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে অর্থ বিলের জন্য প্রস্তাবিত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে পারেন। সূত্র বলছে, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার ভিত্তিতে বিদ্যমান প্রস্তাবে পরিবর্তন বা নতুন কিছু সংযোজনও আসতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে করপোরেট করের হার ২২ থেকে ২৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা ৪৫ শতাংশ পর্যন্তও পৌঁছায়। সেই তুলনায় রপ্তানি প্রণোদনার ওপর ১০ শতাংশ কর অপেক্ষাকৃত কম বলেই সরকার এটি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন রপ্তানিকারকেরা। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে রপ্তানি প্রণোদনার হার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়েছে। এখন আবার কর বাড়ানো হলে কার্যত প্রণোদনার সুফল আরও কমে যাবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিকারকেরা বরং এই প্রণোদনার ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, বর্তমানে দেওয়া প্রণোদনা অনেকটাই প্রতীকী সহায়তায় পরিণত হয়েছে। এর ওপর আবার কর বাড়ানো হলে তা শিল্পের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরও বলেন, পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কর বাড়ানো হলে রপ্তানিকারকেরা আরও সংকটে পড়বেন।
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, প্রণোদনার অর্থ পেতে তাদের দীর্ঘসূত্রতা, নিরীক্ষাজনিত জটিলতা এবং প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়। করের হার বাড়ানো হলে প্রণোদনার কার্যকারিতা আরও কমে যাবে বলে মনে করছেন তারা। বর্তমানে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৪৩টি রপ্তানি খাত এই নগদ সহায়তার আওতায় রয়েছে। বিভিন্ন খাতে প্রণোদনার হার ০ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত।
সব ধরনের পোশাক রপ্তানিতে ০ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা পান ২ শতাংশ সহায়তা। এছাড়া অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে প্রণোদনার হার ৬ থেকে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে পাট ও পাটজাত পণ্যে এ হার ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিল্প খাতকে আগে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে আগামী বাজেটে নতুন করে কর বাড়ানো হবে না। কিন্তু এখন রপ্তানি প্রণোদনার ওপর কর বৃদ্ধির আলোচনা শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

