উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান তৈরি, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরতে এবার নতুন এক খাতকে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের কৌশলও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ সামনে আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণাপত্র তৈরি করেছে। সেখানে এই খাতকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগামী বাজেটের অন্যতম আলোচিত দিক হতে পারে এই উদ্যোগ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি অন্তত ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের ধারণা, প্রচলিত শিল্পখাতের বাইরে তরুণদের জন্য নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে এই খাত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে নতুন বাজেটে এ খাতের জন্য অন্তত ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আগামী বাজেটের আয়-ব্যয়ের খসড়া উপস্থাপন করবে অর্থ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য ওই বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। সেখানেই সৃজনশীল অর্থনীতির বরাদ্দ নিয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডি বলছে, মানুষের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান এবং মেধাস্বত্বই এই অর্থনীতির মূল সম্পদ। তুলনামূলক কম অবকাঠামোনির্ভর হওয়ায় এটি তরুণদের জন্য দ্রুত বিকাশমান একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সরকারের পরিকল্পনায় চলচ্চিত্র, সংগীত, অনলাইন কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, গেমিং, ভিএফএক্স, সফটওয়্যার, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্যাশন, লোকসংস্কৃতি, হস্তশিল্প, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ডিজিটাল বিপণন এবং সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টকে সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় আনা হচ্ছে।
এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ গড়ে তোলা, কর্মদক্ষতাভিত্তিক অনুদান চালু এবং ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ নামে একটি বিশেষ সংস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীল সক্ষমতা তুলে ধরতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের সৃজনশীল দক্ষতা এখন বড় অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ নিতে পারে। শুধু দেশীয় চাকরির বাজার নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কী কী সুবিধা থাকতে পারে:
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিকভাবে এই খাতে বিশেষ স্টার্টআপ তহবিল, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ সহায়তা এবং প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল আয়ের ব্যবস্থা এবং কনটেন্টভিত্তিক ই-কমার্স সম্প্রসারণেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ মনে করছে, বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ইউটিউব, ফেসবুক, গেম ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল ডিজাইন এবং অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। নীতিগত স্বীকৃতি পেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
এ সংক্রান্ত সরকারি উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এই খাতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সরকার সরাসরি ঋণনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক টেকসই অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ অর্থায়ন এবং বিশেষ ভেঞ্চার বা স্টার্টআপ তহবিল গঠনের সুপারিশও করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। এই খাতে কর্মসংস্থান রয়েছে অন্তত ৫ কোটি মানুষের। ২০২২ সালে বৈশ্বিক সৃজনশীল সেবার রপ্তানি দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সৃজনশীল পণ্যের রপ্তানি ছিল ৭১৩ বিলিয়ন ডলার।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০১০ সালে বৈশ্বিক সৃজনশীল সেবার রপ্তানিতে উন্নয়নশীল দেশের অংশ ছিল ১০ শতাংশ, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে। বিভিন্ন দেশে জিডিপিতে এই খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ৪ দশমিক ২ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, বাংলাদেশও সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট, লোকসংস্কৃতি, ফ্যাশন এবং গেমিং শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ:
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অর্থ বিভাগ মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দুর্বলতা, পাইরেসি, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের সংকট, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকারকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ ছাড়া উচ্চমানের স্টুডিও, আধুনিক প্রডাকশন সুবিধা এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় দেশের সৃজনশীল শিল্পের প্রকৃত অবদান নিরূপণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশা, জাতীয় বাজেটে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সৃজনশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বাড়াতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয় এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন থাকায় আগামী বাজেট সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।

