দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার। এখন থেকে বেসরকারি খাতকে জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। এর মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।
বিষয়টি বাস্তবায়নে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় “বেসরকারি জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৬” প্রণয়ন করছে। নীতিটি শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন সচিব মো. জাকিরিয়া।
খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। ভবিষ্যতে শিল্পায়ন আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে বাণিজ্যের পরিমাণও বাড়বে। এই বাড়তি চাপ সামলাতে সরকার একা নয়, বরং বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে কার্গো ওঠানামা, পণ্য খালাস ও অন্যান্য সেবা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
বন্দরে চাপ ও সীমাবদ্ধতা:
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে আমদানি দাঁড়িয়েছে ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্যই সমুদ্রবন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই অর্থবছরে বন্দরগুলো ৩০ লাখ টিইইউ কনটেইনার, ১০ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো এবং প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জাহাজ হ্যান্ডেল করেছে। তবে অনেক সময় বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা এসব চাপ সামলাতে পারে না। ফলে জট তৈরি হয়, কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হয় এবং রপ্তানি পণ্যের শিপমেন্টেও বিলম্ব ঘটে।
জেটি বা বার্থ মূলত এমন একটি কাঠামো, যেখানে জাহাজ নোঙর করে পণ্য খালাস ও লোড করা হয়। খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি বা বেসরকারি জমি—উভয় ক্ষেত্রেই বন্দরের সীমানার মধ্যে বেসরকারি উদ্যোক্তারা জেটি নির্মাণ ও পরিচালনা করতে পারবেন। তবে এর জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। সরকারের অংশীদারিত্ব আছে এমন কোম্পানিও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে এসব অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে দেশীয় উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন এবং বন্দরের বিভিন্ন সেবার খরচও কমতে পারে। তবে তিনি জোর দেন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর। তার মতে, যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন না হলে এই নীতির সুফল পাওয়া যাবে না। আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে সেবাখাতে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। ফলে যেখান থেকে ভালো সেবা পাওয়া যাবে, ব্যবহারকারীরা সেখানেই যাবে। এতে শেষ পর্যন্ত সবাই লাভবান হবে।
বিশ্বে সাধারণত চার ধরনের বন্দর ব্যবস্থাপনা রয়েছে—সার্ভিস পোর্ট, টুল পোর্ট, ল্যান্ডলর্ড পোর্ট এবং সম্পূর্ণ বেসরকারি পোর্ট। সরকার যে মডেল অনুসরণ করতে যাচ্ছে, সেটি হলো “ল্যান্ডলর্ড পোর্ট” মডেল। এতে জমির মালিকানা থাকে সরকারের হাতে, কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার বড় অংশই করে বেসরকারি খাত।
বাংলাদেশের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এই মডেলের উদাহরণ। বর্তমানে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর মূলত টুল পোর্ট মডেলে পরিচালিত হয়। এখানে জমি, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে সার্ভিস পোর্টে পুরো ব্যবস্থাই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর সম্পূর্ণ বেসরকারি পোর্টে জমিসহ সবকিছুই বেসরকারি মালিকানায় থাকে। ভারতের আদানি গ্রুপের মুড্রা বন্দর এ ধরনের একটি উদাহরণ।
খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি জেটি ও টার্মিনালগুলোকে সংশ্লিষ্ট বন্দরের অপারেটিং সিস্টেম বা অনুমোদিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত ফি প্রদান বাধ্যতামূলক থাকবে। কাস্টমস কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও রাখতে হবে।
কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমে। আমদানি-রপ্তানি ও হ্যান্ডলিং ফি বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলাদা চুক্তি হবে। এই প্রকল্পে অংশ নিতে চাইলে আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ লাখ টাকা, যা ফেরতযোগ্য নয়। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে সরকারকে ১ কোটি টাকা জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের বড় ব্যবহারকারী বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। তারা তুলা, সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। বর্তমানে দেশে তিনটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে—চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা। এছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন রয়েছে, যা চলতি বছর চালু হওয়ার কথা।
চট্টগ্রাম বন্দরেই দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এখানে রয়েছে মোট ১৮টি জেটি ও কনটেইনার টার্মিনাল, যার মধ্যে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল অন্যতম।

