দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে বড় ধরনের অবকাঠামো পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। নিরাপদ ও দ্রুত ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবার মান উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক রেল সংযোগ আরও শক্তিশালী করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ সভায় ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম ধাপ)’ শীর্ষক প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রেলওয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য তিনটি—নির্ধারিত গতিতে নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মান উন্নয়ন এবং রেল অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো।
কর্মকর্তারা আরও জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো অবকাঠামোর কারণে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডর।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগের সদস্য এস এম শাকিল আখতার বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের রেললাইন আধুনিকায়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ সময়োপযোগী। একই সঙ্গে তিনি জানান, দেশে এখনো আধুনিক লোকোমোটিভ, কোচ ও মালবাহী বগির ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহে পৃথক প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কে ১ হাজার ৯৩০ দশমিক ৮৮ রুট কিলোমিটার এবং ২ হাজার ৫০৫ দশমিক ৫০ ট্র্যাক কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এসব রুটে নিয়মিত যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে।
তবে এই নেটওয়ার্কের বড় অংশ ১৯৩০, ১৯৪৩, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে নির্মিত হওয়ায় অনেক জায়গায় অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কিছু অংশে ক্ষয়ের হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে রেললাইনে ফাটল, ওয়েল্ডিং জোড়ায় ত্রুটি এবং লাইন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা নিরাপদ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, স্লিপার ও ব্যালাস্টের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ স্লিপার নষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি ব্যালাস্টের ঘাটতির কারণে ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা ও গেজ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
সৈয়দপুর–জয়দেবপুর করিডোরসহ কয়েকটি রেলপথ ২০০০ সালের শুরুর দিকে পুনর্বাসন করা হলেও বর্তমানে অতিরিক্ত ট্রেন চলাচলের কারণে এসব রুটে চাপ বেড়েছে। ফলে রেললাইন, স্লিপার ও ফিটিংস দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। অনেক এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, এতে সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ভবানীপুর থেকে এমজিএমসিএল পর্যন্ত ২১ দশমিক ৪৯২ কিলোমিটার রেলপথ সংস্কার ও পুনর্বাসন করা হবে। পাশাপাশি ৫০০ দশমিক ২ কিলোমিটার রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ৪৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার রেলপথ সম্পূর্ণ পুনর্বাসন করা হবে।
প্রথম ধাপে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে মালবাহী পরিবহন সচল থাকে। এর মধ্যে রয়েছে জয়দেবপুর–ইব্রাহিমাবাদ, সয়দাবাদ–ঈশ্বরদী বাইপাস, ঈশ্বরদী বাইপাস–মালঞ্চি, ভেড়ামারা–ঈশ্বরদী বাইপাস, মালঞ্চি–সাহাগোলা, সাহাগোলা–সান্তাহার, সান্তাহার–জয়পুরহাট, জয়পুরহাট–বিরামপুর, বিরামপুর–পার্বতীপুর, আব্দুলপুর–রাজশাহী কোর্ট এবং ভবানীপুর–মধ্যপাড়া রেলপথ।
প্রকল্প এলাকা রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের একাধিক জেলায় বিস্তৃত। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী ও কুষ্টিয়া জেলা অন্তর্ভুক্ত।
দেশীয় পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এই প্রকল্প আঞ্চলিক রেল সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে। পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলপথ বেনাপোল, দর্শনা, রহনপুর, বিরল ও চিলাহাটি স্থলবন্দর দিয়ে মালবাহী পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করছে। এসব পথে নিয়মিত পাথর, বোল্ডারসহ ভারী পণ্য পরিবহন করা হয়। কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে রেলভিত্তিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার হবে।
প্রকল্পটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার ফোরাম, বিমসটেক এবং বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল উদ্যোগের আঞ্চলিক সংযোগ কাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছে।

