বাংলাদেশের শ্রম খাত নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, দেশের মোট শ্রমবাজারে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের মধ্যে ৯৪ শতাংশেরই দক্ষতার বড় ঘাটতি রয়েছে।
বর্তমান আধুনিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই দক্ষতার ঘাটতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের স্বল্প দক্ষতার কারণে কর্মসংস্থানের পরিসরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আত্মকর্মসংস্থান নয় বরং পুরো শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমশক্তির বাস্তবতা দেশের প্রায় সব শ্রম খাতেই বিদ্যমান। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক পরিবর্তনের রূপরেখা।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে পুরো শ্রমশক্তির সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত। অতীতের নীতি ব্যর্থতার পেছনেও তথ্য ঘাটতির বড় ভূমিকা ছিল বলে তারা উল্লেখ করেন। তাই শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র পরিষ্কার করা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
কোন খাতে কতজন কাজ করছেন, কতজন দক্ষ এবং কতজন অদক্ষ, এবং ভবিষ্যতে কোন খাতে কত জনশক্তির চাহিদা তৈরি হবে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা জরুরি। এই ভিত্তিতে দক্ষ জনবল গড়ে তুললে তা স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও দেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে শ্রম খাতে অদক্ষতার পেছনে বড় একটি কারণ হলো প্রশিক্ষণের অভাব। আত্মকর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও সীমিত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার চলতি মাসে প্রকাশিত ‘আজীবন শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দক্ষতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ গত তিন বছরে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। অথচ এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। গত এক দশকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা থাকলেও অগ্রগতি হয়েছে ধীর গতিতে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৯২ শতাংশেরও বেশি।
এই পরিস্থিতিতে মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকট। করোনা মহামারি, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকট কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে আরও বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। মানুষ বাধ্য হয়ে যেকোনো কাজ গ্রহণ করছেন। এতে ছদ্ম বেকারত্বও বাড়ছে। এ বাস্তবতার একটি চিত্র উঠে আসে ২০২৪ সালে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত দুই ধাপে ২ হাজার ১৭২ জন ওয়েম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদটির কাজ মূলত রেলপথ পরিষ্কার রাখা এবং রেললাইনের ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ করা। এতে নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল এসএসসি বা সমমান।
তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর দেখা যায়, তাদের সবাই স্নাতকোত্তর বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন। এটি শোভন কর্মসংস্থানের অভাব কতটা গভীর, তার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সমস্যার আরেকটি মূল কারণ হলো শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে দূরত্ব। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়টি তুলে ধরলেও কার্যকর সমাধান এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই ভিন্ন ধরনের এবং কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।
সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলছে। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন সমন্বিত বাস্তব উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও পরামর্শ সহায়তা এবং নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ।
তাদের মতে, আত্মকর্মসংস্থান খারাপ নয়। তবে বাধ্য হয়ে নেওয়া অদক্ষ আত্মকর্মসংস্থান দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দক্ষ উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং শ্রমবাজারে আত্মকর্মসংস্থানের অবদান আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে দক্ষতা অর্জনের আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।

