বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৮ কোটিরও বেশি। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে কর্মসংস্থানের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দারিদ্র্য কমাতে তাই বৈদেশিক কর্মসংস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ উঠে আসে নেত্রকোনার রাজিব তালুকদারের জীবনে। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে জীবিকার তাগিদে তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান। বিদেশে গিয়ে একসময় তাঁর মা একটি আবদার করেন—ছেলেকে বিয়ে করিয়ে হেলিকপ্টারে করে পুত্রবধূকে বাড়িতে আনা হবে।
মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী রাজিব। গত ২৫ এপ্রিল তিনি হেলিকপ্টারে করে স্ত্রীকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, রাজিবের মা নিজেও ছেলের সঙ্গে হেলিকপ্টারে চড়ে পুত্রবধূকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
রাজিবের মতোই দেশের লাখো তরুণ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারের যারা বিদেশে কাজ করতে গেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পেয়েছেন। যেকোনো সংকটকালেও এসব পরিবার অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা ভালোভাবে সামাল দিতে পারছে। অন্যদিকে দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের বড় অংশের মানুষ এখনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তবে তাদের অর্ধেকেরও মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে ২৬ লাখের বেশি বেকার রয়েছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ। এই বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক বা তারও বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন।
দেশের মোট কর্মক্ষম জনশক্তির প্রায় ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হয় অভিবাসনের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যেত। তারা আরও মনে করেন, বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে বিদেশে আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতো। তাই এখন সময়ের দাবি হলো দক্ষ, অতিদক্ষ এবং আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তোলা।
এক্ষেত্রে অভিবাসনে আগ্রহীদের অন্তত একটি বা সম্ভব হলে দুটি কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে বিদেশে যাওয়া উচিত। পাশাপাশি ইংরেজির পাশাপাশি আরও অন্তত একটি বিদেশি ভাষা শেখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে দেশে কাজের জন্য যাওয়া হবে, সেই দেশের ভাষা, আইনকানুন, খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়া, কর্মপরিবেশ এবং বেতন কাঠামো সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা থাকলে তুলনামূলকভাবে ভালো বেতন ও উন্নত কর্মপরিবেশ পাওয়া সম্ভব।
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই বৈশ্বিক চাপের পাশাপাশি দেশের ভেতরের আর্থিক চিত্রও উদ্বেগজনক। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ঋণ ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতেও সংকট গভীর হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি, যা আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর চাপ তৈরি করছে।
রপ্তানি খাতেও টানা দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। গত আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যায়। এর ফলে রপ্তানি আয়ে টানা পতন দেখা দেয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন ক্রয়াদেশে কোনো উন্নতি হচ্ছে না। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শেষ কিস্তির ঋণ ছাড় না হওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অর্থনীতির প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি বছরের মার্চে প্রবাসীরা ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা স্বাধীনতার পর একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এপ্রিলেও এসেছে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে মোট রেমিট্যান্স ছিল ২৭ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে। এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে বছরে রেমিট্যান্স আয় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময় তারা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে অতীত রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় রেমিট্যান্স প্রবাহে পরিবর্তন এনে তারা অর্থনৈতিক চাপের বার্তা দিয়েছিলেন বলেও মত বিশ্লেষকদের। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আবার বৃদ্ধি পায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়তে শুরু করে, যা বর্তমানে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। কারণ, এই আয় প্রবাহে সরাসরি বড় ধরনের সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না, কিন্তু এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসে অবস্থান করছেন। একজন অভিবাসীর আয়ের ওপর গড়ে চার থেকে পাঁচজন সদস্য নির্ভরশীল। সেই হিসেবে প্রায় এক কোটি অভিবাসী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু পরিবার নয়, স্থানীয় উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রত্যন্ত গ্রামেও আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছেন তারা। নিজের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি অনেকেই এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নেও অবদান রাখছেন। এতে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করে তারা নিজেদের পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছেন। অনেকেই নিজের আয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন, ব্যাংকে সঞ্চয় গড়ে তুলেছেন এবং সন্তানদের শিক্ষিত করে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।
অন্যদিকে, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা মূলত চাকরিনির্ভর হয়ে গড়ে উঠছে। ফলে চাকরি না পেলে এই পুঁথিগত শিক্ষার কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে এবং তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার জরুরি। এতে তরুণরা দেশে ও বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশে লাখো শিক্ষিত বেকার থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হচ্ছে। ফলে অনেক সময় স্থানীয় তরুণরা বিদেশি কর্মীদের অধীনে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, একই পরিবারের দুই সন্তানের মধ্যে একজন প্রচলিত শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা নিয়েও ভালো চাকরি না পেয়ে হতাশ হচ্ছে, আর অন্যজন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে বা বিদেশে ভালো আয় ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করছে।
দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমেছে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আরও প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্য কমাতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক: হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

