বাংলাদেশে ২১ বছর ধরে ব্যবসা করছে টেলিকম খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি বাংলালিংক। দেশে তাদের ২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রম, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইওহান বুসে।
ইওহান বুসে: আমার কাছে প্রথম চ্যালেঞ্জ মনে হয় এ দেশের কর–কাঠামো। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই খাতে কর অস্বাভাবিক রকমের বেশি। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর জটিলতা ও নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। আর তৃতীয় চ্যালেঞ্জ মনে হয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে।
ইওহান বুসে: বাংলাদেশের আগে আমি সিঙ্গাপুরে কাজ করেছি। সেখানে করপোরেট কর ২২-২৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। এ ছাড়া সিম কার্ড ট্যাক্সসহ বেশ কিছু শুল্ক-কর রয়েছে। সব মিলিয়ে টেলিকম খাতে আমরা গ্রাহকের কাছ থেকে ১০০ টাকা সংগ্রহ করলে তার ৭০ টাকা সরকারি কোষাগারে চলে যায়। ফলে আমাদের হাতে খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ে কিছু অদ্ভুত নিয়মও রয়েছে।
যেমন এখানে কোম্পানিকে লেনদেনের (রাজস্ব) ওপর কর দিতে হয়। অথচ কর হওয়া উচিত মুনাফার ওপর। দেশে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ ব্যবহারের খরচও বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভালো উদাহরণ হতে পারে। কয়েক মাস আগে পাকিস্তান তাদের স্পেকট্রাম–সংক্রান্ত কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। তারা দাম কমিয়ে স্পেকট্রাম আরও সহজলভ্য করেছে। এতে সরকার আগের সমান অর্থই পাচ্ছে। তার বিপরীতে টেলিকম অপারেটররা কম খরচে তরঙ্গ কেনা ও গ্রাহকদের উন্নত সেবা দিতে পারছে। অবশ্য বাংলাদেশে গত ছয়-সাত মাসে আমি বেশ কিছু ভালো পদক্ষেপ দেখেছি। যেমন টেলিকম খাতে প্রায় ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধন ছিল। এখন তা কমিয়ে ১৩টিতে আনা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক।
ইওহান বুসে: ভালো করব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মূল কোম্পানি ‘ভিওন’ ইউক্রেন, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও বাংলাদেশে কাজ করছে। আমরা জানি কীভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। কিন্তু উচ্চ ও জটিল করব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে এফডিআই খুব কম। দেশে এখনো বিশাল একটি ‘গ্রে ইকোনমি’ (অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত) রয়ে গেছে এবং বিভিন্ন খাতে প্রচুর করছাড় রয়েছে।
এটি অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের চমৎকার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। যাদের ওপর ইতিমধ্যে উচ্চ কর ধার্য করা আছে, তাদের ওপর আর কর বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আমার মনে হয় সরকার যে বড় পদক্ষেপটি নিতে পারে তা হলো—করব্যবস্থাকে সহজ করা, করের হার কমানো এবং এর পরিধি আরও বিস্তৃত করা, যাতে কোম্পানিগুলোর জন্য বিনিয়োগ করা আরও আকর্ষণীয় হয়।
ইওহান বুসে: আমরা বাংলাদেশে ২১ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছি। এখানে আমাদের ২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু গত চার বছরেই অবকাঠামো ও নেটওয়ার্কের জন্য ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। আমরা কখনোই কোনো ডিভিডেন্ড (মুনাফা) পাইনি। অর্থাৎ বাংলালিংক এখানে লোকসানি কোম্পানি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যে ব্যবস্থায় আপনার আয়ের ৭০ শতাংশ কর হিসেবে চলে যায়, সেখানে মুনাফা করা খুব কঠিন। তারপরও আমরা কেন এখানে আছি? কারণ আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। আমি খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশে আমরা বিনিয়োগ অব্যাহত রাখব। আমাদের আরও ১০ কোটি ডলার এ দেশে বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইওহান বুসে: আমরা চাই বাংলালিংক যতটা সম্ভব স্থানীয় মালিকানাধীন হোক। এ জন্য আমরা বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে যুক্ত হতে চাই। দুই বছর আগে আমরা আইপিওতে যাওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলাম। যদিও নানা জটিলতায় তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো বাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কম। তবে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশে ও আন্তর্জাতিক আইপিওতে যেতে চাই। গত বছর ভিওনের ইউক্রেনের কোম্পানি কিভস্টার যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাকে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আমরাও চাই বাংলাদেশের প্রথম কোম্পানি হিসেবে নাসডাকে তালিকাভুক্ত হতে। বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইওহান বুসে। সম্প্রতি গুলশানে বাংলালিংক কার্যালয়েছবি: তানভীর আহাম্মেদ
ইওহান বুসে: আমাদের একটি তিন বছরের পরিকল্পনা আছে, যা আমরা গত বছর শুরু করেছি। সবাই আমাদের মোবাইল অপারেটর হিসেবে চেনে। আশা করছি, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলালিংক একগুচ্ছ কোম্পানির একটি গ্রুপে পরিণত হবে। আমাদের মূল শক্তি কানেকটিভিটি। এটি ব্যবহার করে আমরা টেলকো থেকে নিজেদের ডিজিটাল অপারেটরে রূপান্তর করতে চাই। ইতিমধ্যে ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করেছি। এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে একটি পিএসপি (পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার) প্ল্যাটফর্ম চালু করব। পাশাপাশি আমরা স্বাস্থ্যসেবা, ই-কমার্স ও রাইড-হেইলিংয়ের মতো ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার কথা বিবেচনা করছি। অন্যান্য দেশে এসব খাতে ভিওনের বিনিয়োগ রয়েছে।
ইওহান বুসে: বিশ্বের কোনো দেশেই শতভাগ কভারেজ নেই। বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মে বড় দেয়াল বা মাটির অনেক নিচে সিগন্যাল পৌঁছাতে পারে না। তবে দেশে নেটওয়ার্কের অসামঞ্জস্যতার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। যেমন বিভিন্ন স্থানে ভবনে বেজ স্টেশন বা টাওয়ার বসানোর অনুমতি পাওয়া যায় না। এ কারণে সিগন্যাল ড্রপ করে। আর দামের বিষয়ে বললে মাথাপিছু আয়ের অনুপাতে বাংলাদেশে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের দাম বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন।
ইওহান বুসে: অবকাঠামো ভাগ করে নেওয়া লাভজনক। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এটি অত্যন্ত জরুরি। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে খুব শিগগিরই আমরা ‘স্টারলিংক’ সেবা আনছি।
ইওহান বুসে: আগামী মাস থেকে স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট–সুবিধা চালু করতে যাচ্ছে বাংলালিংক। বিদ্যমান মুঠোফোনেই গ্রাহকেরা এই সেবা পাবেন। যদি কোনো স্থানে ভূমিতে বেজ স্টেশন না থাকে, তবে ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টারলিংকের স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। একজন জেলে যদি সমুদ্রের ২০ কিলোমিটার গভীরেও থাকে, তবু সে স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে। আর ভবনের মধ্যে ইন্টারনেট সমস্যার সমাধান হিসেবে আমরা ‘ভয়েস ওভার ওয়াই–ফাই’ ব্যবস্থা এনেছি।
ইওহান বুসে: স্থানীয় বাজার ফাইভ–জির জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ, বাজারে ফাইভ–জি সক্ষম ফোনের সংখ্যা খুবই কম। অর্ধেক গ্রাহকের কাছে স্মার্টফোনই নেই। ফলে তাদের জন্য ফাইভ–জি অপ্রাসঙ্গিক। আমি বলব না যে ফাইভ–জি লাগবে না। তবে আমাদের এখনই কাজ শুরু করা উচিত।
ইওহান বুসে: বাংলাদেশে তরঙ্গের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো সম্ভব, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা ‘লো ব্যান্ড তরঙ্গ’ আরও বেশি চাই। কারণ, তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি যত কম হয়, ভবনের ভেতরে কভারেজ তত ভালো হয়। আর হাই ব্যান্ড তরঙ্গ প্রয়োজন মূলত গতি ও সক্ষমতার জন্য।
ইওহান বুসে: এ জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। কারণ, আমরা জানি এই ব্যবসা কীভাবে চালাতে হয় এবং আমাদের প্রয়োজনীয় পুঁজি আছে। আমরা ভিওনের যে ১০ কোটি ডলারের এফডিআইয়ের কথা বলেছি, এর বড় অংশই ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য। পাশাপাশি স্কয়ারের সঙ্গে মিলে কম সময়ে আমরা একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারব। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে। আমরা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পেলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আমরা ক্ষুদ্রঋণসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক সেবা চালু করব। সূত্র: প্রথম আলো

