ব্যাংক খাতের চলমান সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধস থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁর মতে, এই সংকট কাটাতে শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়; প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক, ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা অংশ নেন।
বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, যাদের কারণে ব্যাংক খাতে সংকট তৈরি হয়েছে, তাদের ফের সুযোগ করে দিতে আইনে নতুন ধারা যুক্ত করার প্রয়োজন কেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্টভাবে কাজ করে। তাই সংকটের সমাধানেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাসেম হায়দার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিজানুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন বক্তা ব্যাংক খাতের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের ছবি জাদুঘরে সংরক্ষণের প্রস্তাবও দেন।
অর্থনীতির ছয় সংকট:
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে মতভেদ থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হয়েছে এবং কলুষিত নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তিনি ছয়টি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতির স্থবিরতা, বিনিয়োগের অভাব, বাড়তে থাকা বেকারত্ব, আমানতকারীদের দুর্ভোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাব। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একই সঙ্গে সংকট ও পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সমাধান হতে হবে নৈতিকতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে।
তিনি আরও বলেন, অনেক আমানতকারী নিজেদের জমানো অর্থ তুলতে পারছেন না। গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বেকারত্ব প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সমাজে নতুন নতুন সংকট ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংক খাতকে টেকসই ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে।
আলোচনায় ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়। তাঁর মতে, যেসব ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর ক্ষতির হিসাব আলাদা করে পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাতে দুর্নীতি ও দখলদারির কারণে অর্থনীতি আজ চরম চাপের মুখে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক দখল নিয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তা থ্রিলার চলচ্চিত্রের গল্পকেও হার মানায়।
তিনি আরও বলেন, বহু গ্রাহক এখন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ভিড় করছেন এবং তিনিও নিজে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নগদ টাকার ব্যবহার কমানো এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত নতুন ধারা বাতিলের দাবি তোলেন।
সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক ও পেশাজীবী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবেই সে সময় পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই নীরব ছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার থাকলেই একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো। একই সঙ্গে সে সময় গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন বক্তারা।
গ্রাহকদের অনেকে সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকে আবারও কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সেটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। প্রয়োজনে এবার গ্রাহকেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন বলেও জানান তাঁরা।

