বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো অত্যন্ত কম। তবে এই খাতে সক্ষমতা থাকলেও বাস্তব উৎপাদন সেই তুলনায় পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গড়ে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
সরকারের সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নানা উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে এই খাতে অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক অংশ এখনো সীমিত। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। অন্যদিকে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য বলছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট (অন-গ্রিড)। এটি মোট সক্ষমতার মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
সব মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৫ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে অন-গ্রিড ব্যবস্থায় ১ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট এবং অফ-গ্রিড ব্যবস্থায় ৩৭৮ দশমিক ৫২ মেগাওয়াট রয়েছে। তবে এই সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাস্তবে গড়ে এর প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সীমাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে পদ্ধতিগত ও অবকাঠামোগত ঘাটতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, “আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতিগত কিছু সমস্যা আছে। কোনো একটি কম্পোনেন্টে ঘাটতি রয়েছে। এজন্য আমরা ৫০ শতাংশ বা তার বেশি উৎপাদন করতে পারছি। এটি আরও বেশি হওয়া উচিত।”
বায়ু, জল ও সৌর—এই তিন উৎসই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উৎপাদনে ওঠানামা ঘটে। বাতাসের গতি কমলে বায়ুবিদ্যুৎ কমে যায়, পানির প্রবাহ কমলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন হ্রাস পায়, আর সূর্যালোক না থাকলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়।
স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ। সৌর খাতে অফ-গ্রিডে ৩৭৭ দশমিক ৪৩ মেগাওয়াট এবং অন-গ্রিডে ১ হাজার ৭৪ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াটসহ মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৪৫২ দশমিক ১৬ মেগাওয়াট। বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ৬২ মেগাওয়াট এবং জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। বায়োগ্যাস থেকে শূন্য দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট এবং বায়োমাস থেকে শূন্য দশমিক ৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যা সম্পূর্ণ অফ-গ্রিড ভিত্তিক।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “এভাবে হওয়ার কথা নয়। কিছু দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় তারা মাঝে মাঝে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।”
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে উৎপাদন কমে যায়। জলবিদ্যুতেও পানির উচ্চতা কমলে জেনারেশন কমে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমরা চাহিদামতো বিদ্যুৎ পাচ্ছি।”
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১২ মে সন্ধ্যায় পিক সময়ে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৭৬৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৮২ মেগাওয়াট। একই দিনে দিনের সর্বোচ্চ সময়ে মোট উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৮১৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ ৭৭ মেগাওয়াট, সৌরবিদ্যুৎ ৫৬২ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ ৩ মেগাওয়াট।
এর আগের দিন ১১ মে সন্ধ্যায় মোট উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৬১১ মেগাওয়াট, যেখানে জলবিদ্যুৎ ৮২ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ ৭ মেগাওয়াট। ১১ মে দিনের সর্বোচ্চ সময়ে মোট উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ ৮০ মেগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ ৬৯০ মেগাওয়াট।
এই দুই দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বড় অংশই আসে সৌর উৎস থেকে। রাতে সূর্যালোক না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকে। ১২ মে দিনের সর্বোচ্চ সময়ে মোট উৎপাদনের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ছিল ৬৪২ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন হয়েছিল ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ১১ মে দিনের সর্বোচ্চ সময়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ছিল ৭৭০ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সেই দিন সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন হয়েছিল ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখনও পূর্ণ ব্যবহার থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

