জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে দেশের কর ও ভ্যাট কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে নেওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা এবং করদাতার পরিধি আরও বিস্তৃত করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে করের বাইরে থাকা অর্থনীতির বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে কর কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে ভ্যাট ও কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের একাংশ মনে করছেন, বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগে ধীরগতির মতো চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর ও ভ্যাট নীতি কার্যকর হলে সাধারণ ভোক্তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশাল এ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘোষণার আগে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ভ্যাটের আওতা বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা এনবিআরের:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী বাজেটে করের হার না বাড়িয়ে বরং ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ পরিকল্পনার কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান।
তিনি বলেন, কর ও ভ্যাট ফাঁকি রোধে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। বিশেষ নজর দেওয়া হবে সিগারেটসহ প্যাকেটজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়ে।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করলেও কর পরিশোধ করছে না, তাদের চিহ্নিত করতে এনবিআর এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় বা মৃত ব্যক্তির নামে থাকা টিআইএন নম্বর বাতিলের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা কমছে:
বর্তমানে বছরে ৩০ লাখ টাকা বা তার বেশি টার্নওভার হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নতুন বাজেটে এই সীমা কমিয়ে ২০ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো হলেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় চলে আসবে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে থাকা লাখ লাখ ছোট ব্যবসা এখনো ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাদের কর কাঠামোর মধ্যে আনতেই এই সিদ্ধান্ত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।
ব্যবসা পরিচালনায় বাড়ছে পরিচয় নম্বরের শর্ত: ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নতুন কিছু শর্ত আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী—
- ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুলতে পরিচয় নম্বর প্রয়োজন হবে।
- ব্যবসার নামে জমি বা গাড়ি নিবন্ধন করতেও এই নম্বর বাধ্যতামূলক করা হবে।
- বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ পেতেও একই শর্ত প্রযোজ্য হবে।
- মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা অ্যাকাউন্ট চালুর ক্ষেত্রেও এটি লাগবে।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকাশ, নগদ, রকেট, এমক্যাশসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবাকে সরাসরি ই-ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও ভ্যাট পরিশোধ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ফিরছে সহজ ভ্যাট ব্যবস্থা, নাম ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’:
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজীকৃত ভ্যাট ব্যবস্থা আবারও ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একসময় চালু থাকা ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থা নতুন কাঠামো ও নতুন নামে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার এর নাম রাখা হচ্ছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’।
নতুন এই ব্যবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের জটিল হিসাব রাখা বা মাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করলেই সেটি রিটার্ন হিসেবে গণ্য হবে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসার ধরন ও অঞ্চলভেদে এই সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের হার নির্ধারণ করা হবে।
বছরে এক হাজার টাকার ভ্যাটের পরিকল্পনা:
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বছরে এক হাজার টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে যেসব ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।
এনবিআরের যুক্তি অনুযায়ী, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসা কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। সামান্য পরিমাণ হলেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, শুরুতে কম হার নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তা বাড়তে পারে।
ভ্যাট নিবন্ধন সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেশের ৪৬৫টি বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সদস্যদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এনবিআর। সদস্যদের নাম, ঠিকানা এবং ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর চেয়ে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, এই পদক্ষেপে ব্যবসায়ীরা সংগঠনের সদস্য হতে অনাগ্রহী হতে পারেন এবং এতে সমিতির প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।
চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এই লক্ষ্য বাড়িয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি নির্ধারণ করা হতে পারে। অন্যদিকে, এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশাল এই লক্ষ্য অর্জনে করহার না বাড়িয়ে কর ও ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের কৌশল নিচ্ছে সরকার।
কিছু পণ্যে বাড়তে পারে ভ্যাট:
রাজস্ব বৃদ্ধির অংশ হিসেবে কয়েকটি ভোগ্যপণ্যে ভ্যাট হার বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, প্লাস্টিকের তৈজসপত্র, ফ্রিজ এবং এয়ার কন্ডিশনার। বর্তমানে এসব পণ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার আলোচনা চলছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভ্যাট দ্বিগুণ হলে ফ্রিজের দাম ২ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং এসির দাম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে ভোক্তা চাহিদা কমার পাশাপাশি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্লাস্টিক শিল্প উদ্যোক্তাদের।
নির্মাণ খাতেও ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে। এমএস রড ও অন্যান্য স্টিল পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে প্রতি টনে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ বাড়তে পারে। তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নির্মাণ খাত ইতোমধ্যে চাহিদা সংকটে রয়েছে। নতুন করে ভ্যাট বা কর বাড়ানো হলে বাজার পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব কিছু পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতির চিন্তাও করছে সরকার। প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে সুপারির খোল দিয়ে তৈরি পণ্য, হোগলা পাতার পণ্য এবং মাটির তৈরি তৈজসপত্র। বর্তমানে এসব পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে পরিবেশবান্ধব শিল্পে নতুন বিনিয়োগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব বাড়ানো জরুরি হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফা কে মুজেরি মনে করেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তার মতে, শুধুমাত্র কর ও ভ্যাট বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ করা হলে অর্থনীতিতে চাহিদা আরও কমে যেতে পারে। এর ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে জনমনে প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা উদ্বেগও। একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের চাপ সামলাতে কর ও ভ্যাটের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।
ফলে আসন্ন বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে কতটা ভারসাম্য রাখা সম্ভব হবে। ভ্যাট এমন একটি কর, যা ধনী-গরিব সবার ওপরই প্রভাব ফেলে। তাই এর পরিধি বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার পকেটেই।
সবশেষে দৃষ্টি এখন ১১ জুনের বাজেট ঘোষণার দিকে। সেই বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং জনস্বস্তির বাস্তব চাহিদার মধ্যে সরকার কী ধরনের সমন্বয় আনে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

