বছরের পর বছর বিদেশ থেকে পণ্য আনতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নির্ভর করতে হয়েছে বড় আমদানিকারকদের ওপর। আমদানি নিবন্ধন, শুল্ক-কর, বন্ড লাইসেন্স এবং কাস্টমসের জটিল নিয়মের কারণে অনেকেই চাইলেও সরাসরি বিদেশ থেকে পণ্য আনতে পারেন না। এর ফলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
এই বাস্তবতা বদলাতে দেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) বা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
মিরপুর-১০ এলাকায় ডেন্টাল এক্সেসরিজের ব্যবসা করেন কামরুজ্জামান। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি করলেও তিনি নিজে সরাসরি আমদানি করতে পারেন না। কারণ, আমদানি করতে প্রয়োজন হয় আইআরসি, বিভিন্ন লাইসেন্স, শুল্ক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং কাস্টমসের নানা অনুমোদন। এসব প্রক্রিয়া ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যয়বহুল ও জটিল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকেই পণ্য সংগ্রহ করতে হয়।
তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে সহজ নয়। অনেক সময় বড় আমদানিকারকরা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দামও বাড়িয়ে দেন, যার প্রভাব পড়ে ব্যবসার খরচে। একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী ইমরান আহমেদ। ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সস, মসলা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করলেও তিনি সরাসরি আমদানি করতে পারেন না। ফলে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তার মতে, অনেক সময় পণ্য হাতে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় মেয়াদও কমে যায়। আমদানি সহজ হলে তিনি নিজেই বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আনতে পারবেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অর্থবিলে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় কাঠামোগত সংস্কার।
ফ্রি ট্রেড জোন কী?
ফ্রি ট্রেড জোন হলো দেশের ভেতরে বা সমুদ্রবন্দরসংলগ্ন এমন একটি নির্ধারিত এলাকা, যেখানে বিদেশি পণ্য শুল্ক, ভ্যাট ও কাস্টমস কর ছাড়াই আমদানি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত, পুনঃপ্যাকেজিং, পুনঃলেবেলিং এবং পুনঃরপ্তানি করা যাবে। যদি এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করা হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হবে।
এই ব্যবস্থায় গুদামজাতকরণ বা ওয়্যারহাউজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাঁচামাল ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণ করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করবে। বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানির সময় আগেই শুল্ক পরিশোধ করতে হয় এবং পরে তা ফেরতের জন্য আবেদন করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। নতুন ব্যবস্থায় সেই জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, ফ্রি ট্রেড জোন চালু হলে সীমিত মূলধনের উদ্যোক্তারাও প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবেন। বড় পরিমাণে আমদানি না করেও গুদাম থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এনবিআরের শুল্ক বিভাগের প্রথম সচিব মো. তারেক হাসান বলেন, এ ব্যবস্থা চালু হলে বন্ড লাইসেন্সের প্রয়োজন থাকবে না। ব্যবসায়ীরা শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি ও সংরক্ষণ করতে পারবেন, যা বিশেষভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য উপকারী হবে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশে পণ্য সংরক্ষণ করে এখান থেকে প্রতিবেশী দেশ ও আসিয়ানভুক্ত বাজারে সরবরাহ করতে পারবে। এতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শুরুতে কিছু রাজস্ব কম আসতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার পরিধি বাড়লে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
ফ্রি ট্রেড জোন মডেল ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় ২৭টি, মিশরে ৯টি এবং সিঙ্গাপুরে ৯টির বেশি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) যুগ্ম সম্পাদক সানোয়ার হোসেন বলেন, নতুন ব্যবস্থার ফলে ছোট উদ্যোক্তারাও সহজে আন্তর্জাতিক বাজারের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং ক্ষুদ্র শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
অন্যদিকে, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ মনে করেন, ফ্রি ট্রেড জোনের নীতিমালা প্রণয়নের সময় ব্যবসায়ীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে বাস্তব প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে।
ফ্রি ট্রেড জোনভিত্তিক আমদানি, অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে নতুন একটি কাঠামো জারি করেছে। এতে কনসাইনমেন্টভিত্তিক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পণ্য বিক্রি বা উৎপাদনে ব্যবহার না হওয়া পর্যন্ত মালিকানা বিদেশি সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে। ফলে উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের মূলধন আটকে থাকবে না এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিও কমবে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দেশে ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার জন্য একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়। পরে গত ১৭ জুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসংলগ্ন প্রায় ৬০০ একর জমিতে এই অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।
বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সম্প্রতি বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিকস সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। দুবাই, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ফ্রি ট্রেড জোনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোতে চায়।

