বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানের বোঝা বয়ে চলেছে। চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছর রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি। ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল এই খাত বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে টিকে আছে।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং নানা অনিয়মের কারণে খাতটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ সংযোগ বা হুকিং। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকান, বাজার ও অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। পাশাপাশি মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল বিদ্যুৎ খরচ হলেও তার বড় অংশের কোনো বৈধ হিসাব থাকে না।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের প্রভাব রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অন্যদিকে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও খাতটির আর্থিক সংকট কমছে না, বরং চাপ বাড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোতে সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে এটি ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাবে পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ হাজার ৫৪৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকের কাছে পৌঁছেছে ৮ হাজার ৮১৯ কোটি ইউনিট। ফলে ৭২৪ কোটির বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে হারিয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য অনুযায়ী এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।
বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে একই অর্থবছরে ডেসকোর ক্ষতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ডিপিডিসির ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, পিডিবির ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।
একই সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক অবস্থাও আরও নাজুক হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ বেশি। বিদ্যুৎ সরবরাহে ওই অর্থবছরে বোর্ডের মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের লোকসান রয়ে গেছে।
তথ্য বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্র থেকে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। অথচ বাজেটে এ খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
একই সময়ে বেসরকারি খাত থেকে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনা হয়। প্রতি ইউনিটের গড় দাম দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। এতে গড় উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১২ টাকা ১০ পয়সা।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি নিয়ে তথ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যেখানে মাসিক গড় ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমাতে না পারলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমবে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম একাধিক দফায় বাড়ানো হলেও আর্থিক সংকট কাটছে না। সম্প্রতি বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে খাতে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। তার মতে, জবাবদিহি না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, শুধু দাম বাড়িয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা কার্যকর হচ্ছে না। বরং প্রতিবছর ঘাটতি বাড়ছে। সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা।
বিদ্যুৎ খাতের এই দীর্ঘ সংকট তাই শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও চুরি, সিস্টেম লস ও অনিয়মের পুরোনো চিত্র বারবার নতুন করে ফিরে আসছে। ভর্তুকি আর দাম বাড়ানোর নীতি একদিকে যেমন চাপ কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই খাত কি সত্যিই সংস্কারের পথে হাঁটছে, নাকি একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে? শেষ পর্যন্ত দায় গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপরই। আর তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটাই—এই লোকসানের হিসাব কি শুধু টাকার, নাকি এর পেছনে আছে আরও গভীর কোনো বাস্তবতা?

