দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের বিস্তারের ফলে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ইউনিট সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের দিক থেকে বরিশাল এখনো দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এই তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’ জাতীয় প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে বর্তমানে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট। দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশ ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশালে অবস্থিত।
কর্মসংস্থানের চিত্র অবশ্য ভিন্ন। শুমারি অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন। যা জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে জাতীয় কর্মসংস্থানের অংশ ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।
অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য বলছে, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি ইউনিট এই খাতে পরিচালিত হচ্ছে, যা মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
আকারভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশালে কুটির শিল্প ইউনিট ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশালের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান ১৯ হাজার ৯৪৬টি এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিটে কর্মরত ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।
জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বরিশাল জেলায় অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এখানে ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন। পটুয়াখালীতে রয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি ইউনিট এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় ইউনিট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি এবং কর্মরত ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন।
পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় ইউনিট ৭৪ হাজার ৬৭০টি এবং কর্মসংস্থান ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন। সবচেয়ে কম ইউনিট ঝালকাঠিতে, ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং সেখানে কর্মরত ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবার সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তার মতে, গত এক দশকে বরিশালে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস মনে করেন, কর্মসংস্থানে জাতীয় অংশীদারত্ব কম থাকা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, পারিবারিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়লেও এটিকে প্রকৃত শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে।

