দেশের অন্যতম মূল্যবান মৎস্যসম্পদ ইলিশকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর মতে, শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, ইলিশকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে এবং রপ্তানিযোগ্য সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
গতকাল সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও অবাধ বিচরণের জন্য নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং পানির মান রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নদীতে শিল্পবর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ ফেলা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, জাটকা নিধন, মা ইলিশ আহরণ এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ জালের ব্যবহার শুধু ইলিশ নয়, দেশের অন্যান্য দেশীয় মাছের অস্তিত্বের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ জেলে এখনও দাদননির্ভর জীবনযাপন করেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সরকার বিভিন্ন বাস্তবমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের নতুন উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গবেষণা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা দল গঠনের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি। গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এ দলের পরামর্শের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশের গুরুত্ব সর্বাধিক। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ মাছের প্রতি বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি আলাদা আগ্রহ দেখিয়ে থাকে। তিনি বলেন, জাতীয় সম্পদ হিসেবে ইলিশকে সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ সম্পদ সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনায় গবেষণার বিকল্প নেই।
জেলেদের সহায়তায় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলেদের জন্য প্রায় ২৪ কোটি টাকার সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ইলিশ সংরক্ষণে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। জনসচেতনতা ছাড়া এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ।
এ ছাড়া কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, মৎস্যজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

