দেশের আমদানি–রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এখন গভীর প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক সংকটে পড়েছে। বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বচ্ছতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন ও দক্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে গুটিকয়েক পুরোনো অপারেটরের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। ওইদিন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনার লক্ষ্য নিয়ে ‘শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা–২০২৫’ প্রণয়ন করে। একই দিনে নতুন লাইসেন্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এরপর দেশের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক যোগ্য কোম্পানি সব শর্ত পূরণ করে, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণসহ আবেদন জমা দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশে পুরোনো প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৩ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে পুরো লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। আদেশে ‘তদন্তাধীন বিষয়’ উল্লেখ থাকলেও কী ধরনের তদন্ত বা কেন প্রক্রিয়া থেমে গেল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
একই দিনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সংবাদপত্রে পাঁচ বছর মেয়াদি বড় আকারের দরপত্র আহ্বান করে। এতে সাধারণ কার্গো বার্থ নং ২ থেকে ৮ পর্যন্ত কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, যেখানে নতুন লাইসেন্স প্রক্রিয়াই স্থগিত, সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই দরপত্রে অংশ নেবে। কারণ লাইসেন্স ছাড়া দরপত্রে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। ফলে এটি প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই প্রতিযোগীদের বাইরে রাখার কৌশল বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ অবস্থায় বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়। গত ২৬ এপ্রিল ভার্টেক্স অফ-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ মে হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চান, লাইসেন্স স্থগিতের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং বিতর্কিত দরপত্র কেন বাতিল করা হবে না। আদালত বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর স্বার্থে টেন্ডার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অনুমতি দিলেও তা চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকবে বলে জানানো হয়।
এর মধ্যেই ১১ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ৩০ জুনের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে। বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, লাইসেন্স প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখে এবং নতুনদের অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করে পুরোনো লাইসেন্সধারীদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
ভার্টেক্স অফ-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (ভূ-সম্পত্তি ও বাণিজ্য) রিপন চৌধুরী বলেন, তাদেরকে কৌশলে প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আদালত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রুল জারি করেছেন। কিন্তু সেই রুল নিষ্পত্তির আগেই বন্দর কর্তৃপক্ষ দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। তার দাবি, একইভাবে আরও শত শত আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন জানান, নতুন করে লাইসেন্স প্রদানের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। পূর্বে আবেদনকারীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং যোগ্য ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাবে। তবে দীর্ঘদিন প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় বঞ্চনার অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট সমাধান দিতে পারেননি।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এটি সাধারণ প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাববলয়ের প্রকাশ। তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা যুক্ত নতুন প্রতিষ্ঠান এলে সেবার মান উন্নত হতো এবং ব্যয় কমত। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ায় দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদে আরও সংকটে পড়বে।

