ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী অর্থবছরে মুদি দোকান, কসমেটিকসের দোকান, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লারসহ ১৬ ধরনের ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতায় এনে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ভ্যাটের নতুন উৎস সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যবসা খাতে সুনির্দিষ্ট কর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রচলিত টার্নওভার ট্যাক্সের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঙ্কের কর আদায়ের ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। কোন ব্যবসা কত কর দেবে, তা ব্যবসার ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারণ করে বিধিমালা জারি করবে এনবিআর। প্রাথমিকভাবে বছরে এক হাজার, পাঁচ হাজার বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে জরিপও চলছে।
কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতে, এ উদ্যোগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সদস্য সেলিনা সুলতানা জানতে চান, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান বা খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে কি না এবং গত অর্থবছরে ভ্যাট থেকে সরকারের কত আয় হয়েছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী অর্থবছরে যেসব ব্যবসাকে সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আছে মুদি দোকান, তৈরি পোশাক ও কাপড়ের দোকান, কনফেকশনারি, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্যের দোকান, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও স্যানিটারি পণ্যের ব্যবসা, টাইলসের দোকান, ঢেউটিন-রড-সিমেন্টের ব্যবসা, ফার্নিচারের দোকান, বিউটি পার্লার, মিষ্টির দোকান এবং রেস্তোরাঁ। তিনি আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
কীভাবে কার্যকর হবে নতুন ব্যবস্থা:
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি ৫০ লাখ টাকার বেশি, তারা সাধারণ ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। আর ৫০ লাখ টাকার কম বিক্রির ব্যবসার ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে টার্নওভার ট্যাক্সের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের বিক্রির হিসাব সংরক্ষণ বা সেই হিসাবের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রয়োজন হবে না। দোকানের অবস্থান, বাজারের গুরুত্ব এবং ব্যবসার ধরন বিবেচনায় একটি নির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করে দেবে এনবিআর। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, অন্যান্য সিটি করপোরেশন, জেলা শহর এবং উপজেলা পর্যায়ের বাজার—সব ক্ষেত্রেই ব্যবসার ধরন ও আকার অনুযায়ী আলাদা করহার নির্ধারণ করা হতে পারে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমান ব্যবস্থায় হিসাব সংরক্ষণ ও রিটার্ন জমা দেওয়ার মতো প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য জটিল। নতুন পদ্ধতি চালু হলে তারা বছরে একবার বা নির্ধারিত সময়ে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা দিয়েই করের দায় পরিশোধ করতে পারবেন। এতে রাজস্ব আদায় যেমন সহজ হবে, তেমনি দীর্ঘদিন কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকেও করের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ভ্যাট নিবন্ধন বাড়ানোর লক্ষ্য:
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ ৭৫ হাজার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ১৬ হাজার।
ভ্যাট নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক সীমা তিন কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার নিবন্ধন দ্রুত বেড়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে এনবিআর।
এ লক্ষ্যে দেশের ৪৬৫টি ব্যবসায়ী সংগঠনকে সদস্য তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পৌনে আট লাখের কাছাকাছি হলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট নীতি) মো. আজিজুর রহমান বলেন, সারা দেশে দোকানগুলোর ম্যাপিং ও জরিপ চলছে। এলাকাভেদে করের পরিমাণ নির্ধারণ করে একটি নির্দেশিকা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে এবং আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কারওয়ান বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হান মনে করেন, নতুন ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়তে পারেন। তার আশঙ্কা, কর আদায়ের নামে দোকানে দোকানে অভিযান চালিয়ে হয়রানি করা হতে পারে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনও প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অতীতে প্যাকেজ ভ্যাট নামে অনুরূপ একটি ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তার মতে, ঘন ঘন নিয়ম পরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ীদের জটিলতা বাড়ে। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন বা সরবরাহ পর্যায়ে কর আদায় করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না। অন্যথায় নতুন ব্যবস্থায় ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, বর্তমান আইনে ৪ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্সের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী প্রকৃত বিক্রির তথ্য প্রকাশ করেন না বা কর পরিশোধ করেন না। এই জটিলতা দূর করতেই সরকার সম্ভবত সুনির্দিষ্ট করের পথে হাঁটছে। তার ভাষ্য, নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের হিসাবপত্র সংরক্ষণের ঝামেলা কমবে। তবে করের হার এলাকা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজধানীর অভিজাত এলাকার একটি দোকানের জন্য মাসভিত্তিক নির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করা হতে পারে।
তবে এ ব্যবস্থার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা দেখছেন তিনি। তার মতে, ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করের ব্যয় সরবরাহকারী বা পরিবেশকদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইবেন। সেখান থেকে উৎপাদক বা আমদানিকারকের ওপর চাপ তৈরি হবে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে ভোক্তাদেরই সেই ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, লাখ লাখ ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কর আদায় করা ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য। এর পরিবর্তে উৎপাদক, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের কার্যকরভাবে করের আওতায় এনে ইলেকট্রনিক চালান ব্যবস্থার মাধ্যমে কর পরিপালন নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ না বাড়িয়েই রাজস্ব আয় বৃদ্ধি সম্ভব।

