বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্টহাউসে আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে এসব চুক্তি স্বাক্ষর এবং বিনিয়োগ আগ্রহের ঘোষণা আসে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), চীনে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রোমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই করা হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)-এর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর ও বিনিময় করা হয়।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং চীনের শীর্ষ পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক সংস্কার ও সুশাসনভিত্তিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশটি এখন ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলায় প্রস্তুত। তাঁর মতে, বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় চীন আরও উচ্চ পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমের কিছু অংশ নতুন প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য খুঁজবে, আর বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি চীনে বিডার প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ অফিস স্থাপন, বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বিশেষ ‘চায়না রিলেশনশিপ ডেস্ক’ চালু এবং চীনা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘চায়না ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের, রপ্তানিনির্ভর, শিল্পসমৃদ্ধ এবং উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি চীনা উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সিসিপিআইটির চেয়ারম্যান রেন হংবিন বলেন, টানা ১৬ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়নে পরিচালিত প্রায় ৭০০টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত আছে। তিনি জানান, দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের যোগাযোগ আরও জোরদার করতে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সিসিপিআইটি কাজ অব্যাহত রাখবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও স্থিতিশীলতা, বড় ভোক্তা বাজার এবং প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর সরকার নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ পর্বে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। ফায়ারসাইড আলোচনায় অংশ নিয়ে লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিফেং ঝুয়াং (লিও) এবং কেএমকে গ্রুপের প্রতিনিধি উ ফুহং কেভিন তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এদিকে বিডা জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জন্য জমির প্রভিশনাল বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ২২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি নতুন কারখানা স্থাপন করবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এটি বাংলাদেশে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের দ্বিতীয় কারখানা। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি কারখানা স্থাপন করে, যেখানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সেমিনারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেএমকে গ্রুপ, হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজসহ চীনের কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

