দেশের তৈরি পোশাক খাতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বড় কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী মাসগুলোতে আরও কারখানা বন্ধ হতে পারে। এতে কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউডি-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ঈদের পর থেকেই বাড়ছে ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ:
গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় অবস্থিত ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুটি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার ৮০০ শ্রমিক একসঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারিয়ে অনেক শ্রমিক এখন গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দিতে এসে তারা জানতে পারেন, তাদের চাকরি আর বহাল নেই।
শ্রমিকদের অভিযোগ, আগাম কোনো কার্যকর নোটিশ ছাড়াই তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়ায় অনেকেই এখন পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। দুটি প্রতিষ্ঠানের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—দেশের তৈরি পোশাক শিল্প কি আরও গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
কারখানা বন্ধ ও কর্মী ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকায়। মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য পরিবার হঠাৎ করেই আয়ের উৎস হারিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্সে কর্মরত বিল্লাল সোহাগের মতো অনেক শ্রমিকই জানেন না, আগামী মাসে কীভাবে সংসারের খরচ চালাবেন। সন্তানদের লেখাপড়া, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং নিত্যদিনের ব্যয় মেটানো নিয়ে তাদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে সাভারে চাকরি হারানো অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, বেশি অভিজ্ঞ শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি বেতন দিতে হয় বলে ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোনো কর্মীদের বাদ দিয়ে নতুন শ্রমিক নিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছে।
কেন বাড়ছে কারখানা বন্ধের ঘটনা?
পোশাক শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমে যাওয়া। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও এর প্রভাব অনুভব করছে।
এদিকে উৎপাদন ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, ডলারের সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ অনেক কারখানার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ফলে শ্রম ব্যয়ও বেড়েছে। এটি শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক হলেও উৎপাদনশীলতা একই হারে না বাড়ায় তুলনামূলক দুর্বল অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে পরিচালিত অনেক কারখানা ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে কেউ উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত করছে, আবার কেউ সম্পূর্ণভাবে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
তিন বছরে বন্ধ প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা:
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক কারখানাই এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। উৎপাদন কমে গেলেও ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, কারখানার ভাড়া এবং প্রশাসনিক ব্যয়সহ স্থায়ী খরচ নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, কারখানা বন্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার অংশ। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না থাকায় ২০৫টি এবং আর্থিক সংকটের কারণে ১৯০টি কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করে। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১১টি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, কাঁচামালের সংকট কিংবা কারখানা স্থানান্তরের মতো বিভিন্ন কারণে আরও ৫১টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শুরুতে ক্রয়াদেশের ঘাটতি থাকলেও পরে তা চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয় এবং উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। এসব কারণ মিলেই অনেক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
কারখানা বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ধারাবাহিক ঘটনায় শ্রমিক সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সব সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং চাকরি-পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়িক মন্দাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে শ্রমিক ছাঁটাই করছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘এনশিওরিং আ জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ’স আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বক্তারা বলেন, পোশাক শ্রমিকদের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এবং শুধু ইংরেজি ভাষায় প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা থাকার কারণে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হচ্ছে। তাদের মতে, শিল্পের আধুনিকায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিউএফটির সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আওতায় আগামী তিন বছরে ২২ হাজার ৮১৫ জন পোশাক শ্রমিক ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাকে আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপে পড়বে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং আর্থিক সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে সচল রাখতে কার্যকর সহায়তা দেওয়া। এ জন্য দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা, ব্যাংকঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সেই শ্রমিকদের, যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছেন। এখন তাদের অনেকেই চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
এদিকে প্রতিবেশী ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য পোশাক শ্রমিকদের ওপর বিশেষ ধরনের নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন ভবিষ্যতে মানবশ্রমের কর্মসংস্থানের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

