চার বছর আগে শুরু হওয়া ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মোট ৮২টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬টির। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে বাকি আছে মাত্র এক বছর। অথচ আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ।
প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এখনো ১৬টি সেতুর নকশা প্রস্তুতই হয়নি। একই সঙ্গে এসব সেতুর বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১ শতাংশেও পৌঁছায়নি। অন্যদিকে ১২টি সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় পার হলেও পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং তদারকির ঘাটতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে কারচুপি ও দায়িত্বশীলদের অবহেলার কারণে কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি স্থানে ঠিকাদাররা নির্মাণকাজে বালির পরিবর্তে মাটি ব্যবহার করেছেন। এছাড়া কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পরামর্শকদের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরামর্শকরা এ পর্যন্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তারা এলজিইডির সদর দপ্তরে অবস্থান করছেন। প্রতিবেদনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আর্থিক শৃঙ্খলা, সরকারি নীতিমালা এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই যথাযথভাবে না করে মনগড়া সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তার মতে, এ কারণেই প্রকল্পটি বর্তমানে এমন দুরবস্থার মুখে পড়েছে।
চার বছরেও ধীরগতির সেতু প্রকল্প, পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—সবখানেই প্রশ্ন
২০২২ সালের ২২ মার্চ ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ৩৫টি উপজেলায় মোট ৮২টি সেতু নির্মাণের এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০২২ সালের ১০ আগস্ট থেকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার। তার নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের জনবল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।
প্রকল্পের কাজের মান নিশ্চিত এবং জবাবদিহি বজায় রাখতে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু চার বছরে পিআইসি সভা হয়েছে মাত্র চারটি এবং পিএসসি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে চারবার। ফলে শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে গেছে।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। অনুমাননির্ভর ও মনগড়া সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়ায় শুরু থেকেই নানা জটিলতা দেখা দেয়।
প্রকল্পের মূল বাজেটে নকশা ও প্রকৌশল পরামর্শক খাতে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সেতুগুলোর নকশা এলজিইডির নিজস্ব ডিজাইন ইউনিটের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সেগুলোর ভেটিং নেওয়া হলেও অনেক সেতুর নকশায় ত্রুটি থেকে যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নের সময় জলবৈজ্ঞানিক ও ভূ-গঠনিক তথ্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। যে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সেটিও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরামর্শকরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় কাজের যথাযথ তদারকি হয়নি। এর প্রভাব হিসেবে পাঁচটি সেতু উলম্ব ছাড়জনিত সমস্যায় পড়েছে।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চার বছর পার হলেও ১৫টি সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি ১ শতাংশেও পৌঁছায়নি। এসব সেতুর মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, রাজবাড়ীর কালুখালী, চট্টগ্রামের রাউজান, জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, নেত্রোকোনার কেন্দুয়া, ঢাকার নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জের ঘিওর ও সাটুরিয়া, টাঙ্গাইলের বাসাইল, মেহেরপুরের গাংনী এবং সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার সেতু। চার বছরেও এসব সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন সেতুগুলোর দৈর্ঘ্য ২০ মিটার থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মিটার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৪ কোটি টাকা। এখনও প্রায় ১৪ হাজার ১৯৭ মিটার সেতুর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের কোনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের কাজও সম্পন্ন হয়নি।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময় মাঠপর্যায়ের কারিগরি তথ্য ও জ্যামিতিক নকশার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। এর ফলে কয়েকটি প্যাকেজের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে নিয়োজিত ৪৭ জন পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জন ঢাকায় সদর দপ্তরেই অবস্থান করছেন। সারা দেশে প্রকল্পের কাজ চললেও তারা মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সময় দেননি। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি নির্দেশনা ও লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন কাজে ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ:
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা চুক্তির শর্ত মানেননি। বিশেষ করে গার্ডার নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়নি।
কুমিল্লা সদর উপজেলায় গোমতী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৩১০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুর কাজে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বালির পরিবর্তে মাটি এবং খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় গার্ডারের রড খোলা অবস্থায় থাকায় তাতে মরিচা ধরেছে। একই উপজেলার কালখের পাড়–জনতা বাজার সেতুতেও ঠিকাদারের গাফিলতির বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে কংক্রিটের কিউরিং করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, কাজ চলমান রয়েছে এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ হবে।
মাগুরা সদর উপজেলার ফটকি নদীর ওপর ভাবনহাটি–ট্রিকারখালি সড়কের ১৫০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণেও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় পাগলা নদীর ওপর মনাকশাহাট সড়কের ১৭২ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে পুরো নদী বাঁধ দিয়ে সাটারিং করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সেতুর কাজেও বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং ঠিকাদারদের ধীরগতির কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত হয়নি। ঠিকাদারদের গাফিলতি থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে চুক্তি বাতিলসহ কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৬ শতাংশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। এছাড়া পরিবেশগত কোনো জটিলতা না থাকা সত্ত্বেও ৮২টি সেতুর মধ্যে ১৪টির টেন্ডার প্রক্রিয়াই এখনো শুরু হয়নি।
প্রকল্প পরিচালকের ব্যাখ্যা:
এসব বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার বলেন, শুরুতে বড় প্রকল্পগুলোর কাজ সাধারণত ধীরগতিতে এগোয়। তার দাবি, জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে তিনটি সেতুর নকশা প্রস্তুতের কাজ বাকি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আরও এক বছর সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কোনো ত্রুটি ছিল না। প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শকরা কাজ করছেন এবং নকশা তৈরির কাজ সদর দপ্তর থেকেই পরিচালিত হয়। এ পর্যন্ত পরামর্শকদের ১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সব ঠিকাদার দায়সারা কাজ করছেন—এমন নয়। দু-একটি ক্ষেত্রে ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

