রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই শেষ হচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর। তবে এই অপূর্ণতার পরও নতুন অর্থবছরের জন্য আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে। বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রপ্তানিকারকদের সামনে চাপ আরও বাড়ছে।
সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই হিসাবে জুন মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে রপ্তানি আয় হতে হবে ১১ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের বর্তমান রপ্তানি প্রবণতা ও ইতিহাস বিবেচনায় এটি প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করেই বাংলাদেশ নতুন অর্থবছরে প্রবেশ করেছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর।
ইপিবি চলতি অর্থবছরের জন্য পণ্য রপ্তানিতে ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্য প্রস্তাব করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসবে তৈরি পোশাক খাত থেকে বলে আশা করা হচ্ছে। এ খাত থেকে আগামী অর্থবছরে ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি লক্ষ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, লক্ষ্য অবশ্যই বাস্তবসম্মত ও তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। শুধু আগের বছরের প্রবৃদ্ধি ধরে বড় লক্ষ্য ঠিক করলেই হবে না। কোন বিশ্লেষণ ও সূচকের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। তবে পোশাক খাতের নেতারা মনে করছেন, জ্বালানি সংকটসহ বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে যাচ্ছে।
উচ্চ প্রত্যাশা ও কঠিন বাস্তবতা:
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চাভিলাষী রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত দিলেও তা অবশ্যই বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। তাদের মতে, কেবল বড় লক্ষ্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়, বরং তা অর্জনের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখনো সতর্ক অবস্থানেই রয়েছেন বলে মত তাদের।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অবশ্যই বাস্তবসম্মত ও তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। শুধু আগের বছরের প্রবৃদ্ধি ধরে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। কোন তথ্য, বিশ্লেষণ বা সূচকের ভিত্তিতে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তার মতে, বৈশ্বিক চাহিদা, বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবণতা এবং প্রতিযোগী দেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করেই রপ্তানি লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে ফাস্ট ফ্যাশন নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে অনেক দেশে এ খাতের ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নয়, পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতাকেও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।
রপ্তানিকারক ও বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রপ্তানি খাত দ্বিমুখী চাপে পড়তে পারে। একদিকে গত বছরের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপ, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারের চলমান অনিশ্চয়তা। দ্রুত চাহিদা না বাড়লে ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। উৎপাদন অব্যাহত রাখা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এই সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে শিল্পখাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে সরকার শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং সালমা ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাকাওয়াত উল্লাহ বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পাদুকা রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না, ফলে এ খাতকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। এ বাস্তবতায় চামড়া শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ও কমপ্লায়েন্স মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিশেষ সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ না বাড়ালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত গতিতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
রপ্তানি খাতকে ঘিরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রপ্তানি খাতকে একাধিক বাধার মুখোমুখি হতে হবে, যার প্রভাব উৎপাদন ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশীয় পর্যায়ে জ্বালানি ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি, অর্থায়নের উচ্চ খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে চাহিদার মন্থরতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগী দেশের চাপ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের কঠোর মানদণ্ড বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়, বরং নীতিগত সহায়তা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
এদিকে রপ্তানি খাতে কিছু সম্ভাবনার দিকও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কার্যক্রম গতিশীল করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্ধ কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে রপ্তানি আদেশ গ্রহণ ও সরবরাহের সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
রপ্তানি আয়ের সামগ্রিক চিত্রও চাপের দিকটি তুলে ধরছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রপ্তানি আয়ে অধিকাংশ মাসেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই-মে সময়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম।
এই সময়ে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলারে নেমেছে। হোম টেক্সটাইল খাতে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে আয় দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অন্যদিকে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৪১ কোটি ২০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। প্লাস্টিক পণ্য ও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চামড়া রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেলেও চামড়ার জুতা রপ্তানি কমেছে। পাট ও পাটজাত পণ্য এবং সাইকেল রপ্তানিতে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চামড়াবহির্ভূত জুতা খাতে পতন রপ্তানি খাতের ভারসাম্যহীন চিত্রই তুলে ধরছে।

