গত ৩০ জুনের পর সরকারি ব্যয়সংযম নীতির মেয়াদ আর বাড়ায়নি সরকার। ফলে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি কেনা, আমলাদের জন্য সুদমুক্ত গাড়ি ঋণসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে নতুন কোনো নির্দেশনা এলে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত অর্থবছরের শুরুতে সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। এবারও নতুন কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে, তবে আগের তুলনায় অনেক বিধিনিষেধ শিথিল থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত ৫ এপ্রিল জারি করা সংশোধিত ব্যয়সংযম প্রজ্ঞাপন ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০ জুন। নতুন করে এ নীতি চালু করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের বড় একটি ক্রয়চুক্তিকেও ব্যয়সংযম নীতির সমাপ্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ৮ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি অর্থায়নে বিদেশে কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে নতুন গাড়ি, জাহাজ ও উড়োজাহাজ কেনায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় এবং বিভিন্ন থোক বরাদ্দ থেকেও অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয় এবং কোথাও কোথাও পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে গত ৫ এপ্রিল অর্থ বিভাগ সংশোধিত ব্যয়সংযম নীতির প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বিদেশ সফর, সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ এবং যানবাহন, জলযান, উড়োজাহাজ ও জমি কেনার ব্যয়ের ওপর আগের বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানির বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয় এবং কম্পিউটার ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনার অর্থ ছাড়ও স্থগিত রাখা হয়।
২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারি, ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যাংক খাত থেকে অর্থ বেহাত হওয়ার মতো নানা কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েক বছর ধরে সরকার ব্যয়সংযমের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে আসছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, পরিচালন বাজেটের অনেক ব্যয় বাধ্যতামূলক হওয়ায় ব্যয়সংযম নীতি অনুসরণ করেও সেখানে বড় ধরনের কাটছাঁট করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ধীরগতির। এ অবস্থায় সরকার আপাতত আগের মতো কঠোর ব্যয়সংযম নীতি বহাল রাখতে আগ্রহী নয়। চলতি সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সেখান থেকে নতুন সিদ্ধান্ত এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, সরকারি ব্যয়ের ধীরগতি, বিদেশি ঋণের চাপ এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেও সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির তুলনায় ২ দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সরকার ধাপে ধাপে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ালেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে না। বর্তমান বাস্তবতায় ব্যয়সংযম নীতি অব্যাহত রাখাই বেশি প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও চাপে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকিও এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতের কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের আর্থিক চাপের বাস্তবতায় এখনই ব্যয়সংযম নীতি থেকে সরে আসার উপযুক্ত সময় নয়। বরং এ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ব্যয় বাড়ানো হলে তা মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য অযৌক্তিকভাবে ব্যয় বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঘোষিত মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

