চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করেছে। কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাড়তে থাকা আর্থিক চাপের মধ্যেও এই অর্জন রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজস্ব আয় বাড়লে সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়লেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হবে না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হচ্ছে।
প্রতি বছর বাজেটে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় অনেক সময় নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। এতে রাজস্ব পূর্বাভাসের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরই মূলত কর আদায়ের সক্ষমতা নির্ভর করে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে অতিরিক্ত উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করলে প্রত্যাশা ও অর্জনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বড় সমস্যা করের হার নয়, বরং করদাতার সংখ্যা কম থাকা এবং কর পরিপালনে দুর্বলতা। একই সঙ্গে দেশের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে থাকা বড় একটি অংশ এখনো কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে।
ফলে রাজস্ব সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত করের আওতা বাড়ানো। নতুন করদাতা শনাক্ত করা, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে। পাশাপাশি সৎ করদাতাদের জন্য কর প্রদান প্রক্রিয়াও আরও সহজ করা সম্ভব হবে।
একটি কার্যকর কর ব্যবস্থার জন্য নিয়ম-কানুন সহজ, স্পষ্ট ও স্থিতিশীল হওয়া জরুরি। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং কর আইনের ভিন্ন ব্যাখ্যা ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। করদাতাদের শুধু নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না, বরং জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কর ব্যবস্থায় আস্থা তৈরি হলে স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
রাজস্ব আহরণের সঙ্গে জনগণের আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকরা যখন দেখেন করের অর্থ কার্যকরভাবে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন কর প্রদানের আগ্রহ বাড়ে। বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণে আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি সরকারি রাজস্ব প্রয়োজন হবে। এই অর্থায়ন শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিস্তৃত, ন্যায়সংগত, দক্ষ ও আস্থাভিত্তিক কর ব্যবস্থা।
এনবিআরের সাম্প্রতিক রাজস্ব আদায় অগ্রগতি দেখিয়েছে যে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তবে আগামী দিনের সংস্কারে শুধু বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর। টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধি মানে একটি অর্থবছরে সর্বোচ্চ অর্থ আদায় নয়; বরং এমন একটি কর ব্যবস্থা তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়তা করতে পারে।

