বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ফরেন ইনভেস্টরস’ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)।
সংগঠনটির মতে, বর্তমানে দেশের এফডিআই প্রবাহ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘এফডিআই ফর এ নিউ বাংলাদেশ: রোডম্যাপ ফর এ ১৫ বিলিয়ন ডলার ভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফিকি। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় ‘ফিকি এফডিআই কনফারেন্স ২০২৬: ড্রাইভিং ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ফর জবস অ্যান্ড প্রসপারিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্মেলনে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
ফিকির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিনের নীতিগত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং আর্থিক খাতের সমস্যাগুলো বিদেশি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ এবং প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো চাহিদার অর্থায়নে শক্তিশালী এফডিআই প্রবাহ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি হলেও এফডিআই আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। দেশের এফডিআই-টু-জিডিপি অনুপাত মাত্র ০ দশমিক ২৯ থেকে ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ। যেখানে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ হার ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
ফিকি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে এফডিআই কিছুটা বাড়লেও এর বড় অংশ এসেছে দেশে থাকা বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা থেকে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরাসরি ইক্যুইটি বিনিয়োগ এখনো সীমিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য উদারীকরণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান উপাদান। জিডিপির তুলনায় বাণিজ্যের অনুপাত ১ শতাংশ বাড়লে এফডিআই প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ফিকির মতে, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা, উন্নত বন্দর ও কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুললে উৎপাদন খরচ কমবে এবং বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
তবে শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, সেই বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ ডলারের নতুন গ্রিনফিল্ড এফডিআইয়ে গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৩টি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। যেখানে ভারতে এ হার ৬ দশমিক ২, কম্বোডিয়ায় ৪ দশমিক ৪ এবং ভিয়েতনামে ৪ দশমিক ১।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশ বিদ্যুৎ খাতের মতো মূলধননির্ভর খাতে যাচ্ছে। শ্রমনির্ভর উৎপাদন, প্রযুক্তি ও উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্পে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম।
ফিকির প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কম থাকার পেছনে নয়টি কাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নীতিগত অনিশ্চয়তাকে। সরকারি হিসাবে বিনিয়োগ অনুমোদনে ৭৬ দিন সময় লাগার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ২৩টি সরকারি সংস্থা এবং প্রায় ১৫০ ধরনের সেবা নিয়ে কাজ করতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ে।
অবকাঠামো সংকটও বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ঘাটতি, শিল্পের জন্য জমির সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি হস্তান্তরের ধীরগতির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
লজিস্টিকস খাতেও বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থার কথা বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে যেখানে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সেখানে ভিয়েতনামে একই কাজ শেষ হয় ৩ থেকে ৪ দিনে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, ব্যাংক খাতে মূলধনের ঘাটতি, জটিল কর ব্যবস্থা, দক্ষ জনবলের সংকট এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সূচকে দুর্বল অবস্থানকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে ফিকি।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—তিন ধাপে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে ফিকি। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ৩০ দিনের মধ্যে বিডা নিবন্ধন সম্পন্ন, অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ অনুমোদন চার দিনের মধ্যে দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সরকারি সংস্থা সাড়া না দিলে আবেদন অনুমোদিত হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালু, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন বিনিয়োগ ওমবাডসম্যান নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মধ্যমেয়াদে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, বিডার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, নতুন জাতীয় বিনিয়োগ আইন, পাঁচ বছর মেয়াদি এফডিআই কৌশল এবং উচ্চপর্যায়ের জাতীয় এফডিআই সমন্বয় কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ করেছে ফিকি।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, সহজ বিধিমালা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, স্থানীয় কিংবা বিদেশি—সব ধরনের উদ্যোক্তার পাশে সরকার থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বড় বাজার, তরুণ জনশক্তি, কৌশলগত অবস্থান এবং সম্ভাবনাময় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য বড় শক্তি।
তিনি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান।

