দেশের সমাজের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকায় সরকারি বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বুধবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এসডিজি বিষয়ক একটি সম্মেলনে এই বাস্তবতা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। মিরপুর এলাকার এক ভ্যানচালক জানান, ওই এলাকায় ছিন্নমূল মানুষদের একটি বড় অংশের এনআইডি নেই। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি জানান, তাদের ক্ষেত্রে এনআইডি করাতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আরেকজন তরুণ প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, বরিশালের একটি জলজীবী জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও এনআইডি পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সুশাসন-বিষয়ক ইউনিটের যৌথ উদ্যোগে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মও। রাজধানীর একটি সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের শেষ দিনে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার এবং পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো ও এসডিজি নিয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। সভাপতিত্ব করেন একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মাননীয় ফেলো ও ওই নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির একজন অতিরিক্ত পরিচালক। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন অনুষ্ঠানে।
আলোচনায় উঠে আসে, এনআইডি না থাকার কারণে অনেকেই সরকারের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকৃতপক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন সংসদ সদস্য জানান, মূলত জন্মনিবন্ধন না থাকার কারণেই এনআইডি সংক্রান্ত এই জটিলতা তৈরি হয়, এবং এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান একশ দশতম, আর হাতে সময় রয়েছে পাঁচ বছরেরও কম। তাই এখন থেকেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি এবং জানান, সরকার সবার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক—সব ধরনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে এবং এরই অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তার ভাষায়, সরকার সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগোতে চায়।
এর আগে উদ্বোধনী বক্তব্যে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধির হার দেখলেই হবে না, দেখতে হবে তার কাঠামো ও গুণগত মানও। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে এসেছে, বরং সমাজে বৈষম্য বেড়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি তিনজন শিক্ষিত মানুষের মধ্যে একজনই কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধিরা নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।

